বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
স্কুলে ফিরছে ভর্তিযুদ্ধ, কোচিং বাণিজ্যের শঙ্কা
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিদ্যালয়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তিতে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যমান লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি পদ্ধতি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। 

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে এ কথা জানানো হয়েছে। 

মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুন্না রাণী বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া বাতিল থাকবে।

আদেশে উল্লেখ করা হয়, লটারি পদ্ধতি বাতিলের পর অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, এর ফলে ইতঃপূর্বে জারি করা (১৩ ও ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের) সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা দুটি নির্দেশক্রমে বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে মেধা যাচাই বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। জাতীয় সংসদে তিনি ঘোষণা দেন যে, ২০২৭ সাল থেকে স্কুলে ভর্তিতে বর্তমানের ‘লটারি পদ্ধতি’ বাতিল করে আবারও ‘ভর্তি পরীক্ষা’ চালু করা হবে।

এর ফলে প্রত্যাশিত বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শিশুদের আবারও সেই পুরোনো ভর্তির যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। যে কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিশুদের বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে।
 
শিশু বয়সে মেধার তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা যৌক্তিক নয়। এতে বরং শিশুদের ওপর অযাচিত প্রতিযোগিতা হয়। একই সঙ্গে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বাড়তে পারে।

তারা আশঙ্কা করছেন, পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালু হওয়ায় নতুন করে শিক্ষার্থী বাণিজ্য শুরু হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি অভিভাবকরা কোচিংয়ের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করবেন এবং ভর্তি করাতে ব্যর্থ হলে বিত্তশালীরা ‘নামিদামি’ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করাবেন। গরিব শিক্ষার্থীরা ‘নামিদামি’ স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাবে না। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের ঝিমিয়ে পড়া ব্যবসা চাঙা করতে আবারও সক্রিয় হবে।

প্রাথমিকে ভর্তিতে কোনোভাবেই পরীক্ষা নেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো কোচিং বাণিজ্য চলে আসবে। আর এই ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শিশুর মেধার যাচাই করা। এতে ফেল করা মানেই শিশুকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া যে, সে পারে না। এভাবে শিশুকে ট্রমার মধ্যে দেওয়া উচিত না।

বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ও আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সঠিক পদ্ধতি কী হওয়া উচিত- এই বিতর্ক বেশ পুরোনো।

লটারি পদ্ধতি শুরু

লটারি পদ্ধতির সূচনার সময় বলা হয়েছিল, এতে শিশুদের শৈশব রক্ষা হবে ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে। ২০১০ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দেন। 

সরকারের যুক্তি ছিল- যে শিশু এখনো স্কুলেই যায়নি, তাকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানো অমানবিক। সেই সময় শিদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা, কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং ভর্তিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমবে বলে মনে করেছিল সরকার। 

২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও এই পদ্ধতি চালু হয়।

লটারি পদ্ধতি বাতিলে সরকারের যুক্তি

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর লটারি পদ্ধতি বাতিলের পেছনে প্রধানত মেধা যাচাই ও শিক্ষার মান রক্ষাকে বড় করে দেখা হচ্ছে। গত ১৬ মার্চ সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে এই পদ্ধতি তার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। 

এর একদিন পর গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, এখন থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে। সরকারের দাবি, লটারির ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত স্কুলে সুযোগ পাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ফলাফলে। 

তবে প্রশ্ন উঠছে, যে প্রেক্ষাপটে লটারি চালু হয়েছিল, অর্থাৎ শিশুদের ওপর মানসিক চাপ ও কোচিং বাণিজ্য, সেই পরিস্থিতি কি আসলেই বদলে গেছে? শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, গত এক মাস ধরে পর্যালোচনা-আলোচনা করে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, খুব সাধারণ ও সহজ পরীক্ষা নেওয়া হবে।

তবে শিক্ষমন্ত্রীর ঘোষণা এবং পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। কোন কোন সংগঠন এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও করেছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে এখন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা দুই ভাগে বিভক্ত। লটারি পদ্ধতির সমর্থকদের মতে, এই পদ্ধতি অন্তত সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের জন্য নামী স্কুলগুলোর দরজা খুলে দিয়েছিল। একজন দরিদ্র মানুষও তার সন্তানকে লটারির মাধ্যমে ভিকারুননিসা বা হলিক্রসের মতো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারতেন। এছাড়া শিশুদের পরীক্ষার আতঙ্কে পড়তে হতো না।

শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা যা বলছেন 

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গত সোমবার এক সংলাপে বলেছেন, ‘এ ব্যবস্থা (লটারি) প্রত্যাহারের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা জরুরি। লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দেবে।’

এ প্রসঙ্গে এডাল্ট, চাইল্ড অ্যান্ড এডোলেসেন্ড সাইকিয়াট্রি বিশেষজ্ঞ ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান বলেন, ‘প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় ভিড় আর প্রতিযোগিতার মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ থেকে তাদের মনে পড়াশোনার প্রতি অনীহা ও স্কুলভীতি তৈরি হয়। লটারির মাধ্যমে ভর্তি হলে শিশুরা এই অহেতুক মানসিক চাপ থেকে রক্ষা পায়।’

ভর্তিতে লটারি বাতিলের প্রতিবাদ 

স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষার নেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। গতকাল মঙ্গলবার এক যুক্ত বিবৃতিতে ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দীন বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। এটি শিক্ষাকে ক্রমাগত বাজারমুখী করে তোলার একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করার নীতি থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে সরকারকে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয় যখনই ভর্তি পরীক্ষা ছিল, তখনই কোচিং সেন্টারগুলো রমরমা ব্যবসা করেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা মানেই প্রস্তুতির চাপ, আর সেই চাপকে পুঁজি করেই কোচিং ব্যবসা গড়ে ওঠে। যে পরিবারের টাকা আছে, সে কোচিং কিনতে পারবে — যে পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে বাঁচে, তার সন্তান পিছিয়ে পড়বে। এটা শিক্ষার বেসরকারিকরণের প্রথম ধাপ। অবিলম্বে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করার নীতি থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  স্কুল   ভর্তিযুদ্ধ   কোচিং বাণিজ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close