নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ভ্রমণের কথা ভাবলেই ভ্রমণপ্রেমীদের মনে ভেসে উঠে উঁচু নিচু পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে চোখ জুড়ানো সবুজ চা-বাগান আর সারি সারি রাবার ও লেবু-আনারস বাগানের মনোরম দৃশ্য। যেখানে সবুজ প্রকৃতি উজাড়ভাবে সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়। আর পর্যটকেরা হারিয়ে যান চিরসবুজের মাঝে।
চা বাগানের সতেজ সবুজ পাতার মায়া যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মনকে টানতে সক্ষম। চারদিকে প্রকৃতির নজরকাড়া সৌন্দর্য, হাজার প্রজাতির গাছ-গাছালি, দিগন্তজোড়া হাওর আর নীল জলরাশি ঢেউয়ের ছন্দে প্রাণ জুড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের। এখানকার উঁচু-নিচু পাহাড়ের বুকজুড়ে সবুজ চা বাগানসহ নজরকাড়া প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা।
মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা সাত দিনের ছুটিতে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত পর্যটন চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গল। প্রতি ঈদেই বিপুলসংখ্যক ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের সমাগম হয় এ উপজেলায়। এই উপজেলায় পর্যটন স্পটগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টসহ শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ, হোটেল-মোটেল।
এ উপজেলায় পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে চাঁদের গাড়ি নামে পরিচিতি বিভিন্ন রঙের চার চাকার ‘জিপ গাড়ি’। এখানে ভ্রমনে আসা দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের প্রধান আকর্ষণ হলো লাল রঙের ‘চান্দের গাড়ি’।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান মাসজুড়ে প্রায় পর্যটকশূন্য ছিল শ্রীমঙ্গল। পর্যটকের অভাবে স্থবির হয়ে পড়ে চান্দের গাড়ি ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসা। তবে আসন্ন ঈদ উপলক্ষে আবারো আশায় বুক বাঁধছেন চাঁদের গাড়ির চালক ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
আবাসন ব্যবসাযীরা জানান, ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশ হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদকে ঘিরে বাকি দিনগুলোতেও শতভাগ রুম বুকড হয়ে যাবে।
চান্দের গাড়ি চালকরা জানান, রমজান মাসজুড়ে পর্যটন নগরী পর্যটকশূন্য থাকায় থাকায় চালকদের অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তবে তাদের প্রত্যাশা ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আগমনে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনীতি।
স্থানীয় পরিবহন (চান্দের গাড়ি) চালক সুত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে আগত পর্যটকদের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভ্রমণের জন্য প্রায় ৩০০ টি ‘চাঁন্দের গাড়ি’ রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য রিজার্ভ ট্রিপ চালু রয়েছে।
খোলা ছাদের বাহারি রঙের জীপকেই স্থানীয়রা ‘চান্দের গাড়ি’ বা ‘চাঁদের গাড়ি’ বলে থাকেন। ৮-১০ জনের বসার ব্যবস্থা থাকে এসব গাড়িতে।
শহরের স্টেশন রোডস্থ পেট্টল পাম্পের সামনে সাময়িক একটি স্ট্যান্ড রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। শ্রীমঙ্গলের গাড়িগুলো বড়লেখার মাধবকুন্ড ঝর্ণা, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), চা জাদুঘর (টি মিউজিয়াম), নীলকন্ঠ, নূরজাহান চা বাগান, দার্জিলিং টিলা, লালটিলা, মনিপুরী পাড়া, বাইক্কা বিল পর্যন্ত এই চান্দের গাড়ির যাতায়াত করে।
দেশ-বিদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পর্যটক-দর্শনার্থীরা শ্রীমঙ্গলে আসলে ঘোরাঘুরির জন্য তাদের প্রথম পছন্দ চান্দের গাড়ি। ফলে দুই ঈদ, শীত মৌসুম, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসব ও সরকারি টানা ছুটিতে এই শহরের ছান্দের গাড়ির চাহিদা থাকে খুব বেশি। ঈদের ছুটিতে এই গাড়িগুলো পাওয়া দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন পর্যট স্পট ঘুরে দেখার অন্যতম আকর্ষণ এই খোলা জিপ আকৃতির গাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাঁদের বা চান্দের গাড়ি’ নামে পরিচিত। খোলা ছাদের এই গাড়িতে দাঁড়িয়ে পাহাড় ও প্রকৃতির মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন ভ্রমণপ্রেমীরা।
চান্দের গাড়ি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটকদের উন্নত সেবা দিতে চাঁদের গাড়িগুলোর ব্রেকিং সিস্টেম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াতে নতুন করে রং করা হচ্ছে গাড়িগুলো।
চান্দের গাড়ির চালক ইবরাহিম খলিল বলেন, ‘রমজান মাসজুড়ে পর্যটক শূন্য ছিল উপজেলা। পর্যটক তথা যাত্রী না পাওয়ায় প্রায় এক মাস পরিবার চালাতে হিমশিম খেয়েছি। তবে ঈদে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে শ্রীমঙ্গলের চাঁদের গাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য পর্যাপ্ত গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড বা টার্মিনাল না থাকায় পর্যটকদের সেবা দিতে কিছুটা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।’
আরেক চালক শামীম মিয়া জানান, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা অগ্রিম যোগাযোগ করছেন। আশা করছি ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের সমাগম বেশি থাকবে। প্রতিদিন একাধিক রিজার্ভ ট্রিপ থাকবে। এতে আমাদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে যাবে।
সম্প্রতি ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল বেড়াতে আসেন হাসান জামিল। তিনি বেড়ানোর জন্য দুটি চান্দের গাড়ি বুক করে ফেলেন দুদিনের জন্য। তিনি বলেন, পুরো ট্যুরটা ছিল তাদের পরিবারের জন্য খুবই আনন্দদায়ক ও স্মৃতিময়।
চাঁদের গাড়ি মালিক মোহাম্মদ সাগর আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশি পর্যটক কম আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দেশীয় পর্যটকদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গাড়িগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি পর্যটকদের নিরাপদ ও ভালো সেবা দিতে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন ১২২৩ এর কার্যকরী সভাপতি মো. ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর্যটকশূন্যতার কারণে পরিবহন খাত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পর্যটকদের সার্ভিস দেওয়া চান্দের গড়ি চালকরা বিপাকে পড়েছেন। পর্যটক শূন্য থাকায় তাদের আয় রুজি কমে বিপাকে পড়েছেন। তবে ঈদের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও পর্যটক সমাগম বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে পরিবহনের ক্ষেত্রে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে পরিচিত জিপ গাড়িগুলো। এসব গাড়ির মানোন্নয়ন ও সেবার মান বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং এ খাতের উন্নয়নে কাজ অব্যাহত রয়েছে।’
কেকে/ এমএস