মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
নাড়ির টানে বাড়ির পথে, বাসের বিকল্প ট্রাক
এইচ এম আলমগীর কবির, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ৫:০৯ পিএম
ট্রাকে করেই বাড়ি ফিরছে ঘরমুখো মানুষ। ছবি : খোলা কাগজ

ট্রাকে করেই বাড়ি ফিরছে ঘরমুখো মানুষ। ছবি : খোলা কাগজ

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা। বছরের সব ক্লান্তি, কষ্ট আর সংগ্রামের পর প্রিয়জনের মুখে এক চিলতে হাসি দেখার আকুলতা এই এক অনুভূতিই যেন হাজারো শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি। মা-বাবার স্নেহ, সন্তানের অপেক্ষা, গ্রামের সেই চেনা উঠোন—সবকিছুর টানে জীবনের ঝুঁঁকি নিয়েও তারা ছুটে চলছে বাড়ির পথে।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের কড্ডা, নলকা, ঝাঔল ওভারব্রীজ ও হাটিকমুরুল গোলচত্বরে দেখা গেছে এমনই দৃশ্য। 

ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপের ছাদে গাদাগাদি করে বসে আছেন শত শত মানুষ। সব কিছুর কাছে হার মানে জীবনের ঝুঁঁকিও। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউবা একে অপরকে শক্ত করে ধরে শুধু পড়ে না যাওয়ার চেষ্টা। প্রতি বছর ঈদ এলেই এভাবেই রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে চলে হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। মানুষের চোখে ভয় নেই আছে শুধু বাড়ি ফেরার তাড়না।

ট্রাকে রওয়া হওয়া বেশকয়েক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করেও টিকিট না পাওয়া এবং ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। জীবনের ঝুঁঁকি আছে জানি, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে না পারার কষ্ট তার চেয়েও বেশি বলে জানিয়েছে ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষেরা।

ঢাকা থেকে বগুড়ায় রওয়া দেওয়া গার্মেন্টস কর্মী রাশেদা বেগমের কণ্ঠে ধরা পড়ে সেই অসহায় ভালোবাসা। তিনি বলেন, “৫০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা। একটি বাসে অনেক যাত্রীও নেওয়া হয়। টিকিটও পাওয়া যায় না। আমার বাচ্চারা অপেক্ষা করে আছে। ৩শত টাকায় কষ্ট হলেও ট্রাকেই উঠতে হয়েছে। ঈদ তো বছরে একবারই আসে। তাই শত কষ্ট ও ভয় ভুলে বাড়িতে যাচ্ছি।”

তার পাশে বসা আরেক যাত্রী রাজমিস্ত্রী মমিন মিয়া বলেন, “ভাই, ভয় তো লাগে। কিন্তু বাড়িতে না গেলে মায়ের মুখটা দেখব কীভাবে? এই ঝুঁকি নিয়েই যাই, আল্লাহ ভরসা।”

শুধু যাত্রীদের গল্পই নয়, এই যাত্রার নীরব সাক্ষী চালকরাও। নাটোরগামী সিমেন্ট বোঝাই ট্রাক চালক শুক্কুর আলী বলেন, “আমরা জানি এটা ঠিক না। কিন্তু মানুষ এত অনুরোধ করে যে ফিরিয়ে দিতে পারি না। কেউ কেউ বেশি ভাড়া দেয়, আবার কারও চোখের পানি দেখলেও না বলা যায় না। তবে ভয় সবসময়ই থাকে—একটু ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা। তার কথার মাঝেই ফুটে ওঠে বাস্তবতার কঠিন দিক আইন, ঝুঁকি আর মানবিকতার টানাপোড়েন।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিক-আপের চালক জানান, সামনে ঈদ সবাই বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বাসের শ্রমিকেরা বেশি লাভের আশায় ভাড়া অতিরিক্ত নেওয়ার কারণে এই মানুষগুলো ট্রাক ও পিক-আপে ওঠে ঝুকি নিয়ে বাড়িতে যায়। তিনি আরও বলেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে হয়, আবার দুর্ঘটনার ভয়ও সবসময় থাকে।

নগরবাড়ী গামী ট্রাকের যাত্রী নাঈম শেখ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, “প্রিয়জনের টানে ঝুঁকির এই যাত্রা কবে শেষ হবে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে যতদিন না সবার জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত হচ্ছে—ততদিন হয়তো ট্রাকের ছাদই থেকে যাবে হাজারো মানুষের ঈদযাত্রার শেষ ভরসা।”

কড্ডার মোড় এলাকায় রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, “এভাবে ট্রাকের ছাদে যাত্রী বহন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অতিরিক্ত ওজন, ভারসাম্যহীনতা, হঠাৎ ব্রেক যেকোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিকল্প না থাকলে মানুষ ঝুঁঁকির দিকেই ঝুঁঁকে পড়ে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঈদের সময় সেই নিয়ম যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আর টিকিটের অপ্রতুলতা শ্রমজীবী মানুষদের ঠেলে দেয় এই অনিরাপদ যাত্রায়।”

দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস খোলা কাগজকে বলেন, “এটা শুধু পরিবহন সংকট নয়, এটি ভালোবাসা আর বঞ্চনার গল্প। শহরে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন কাটানো মানুষগুলো যখন বছরে একবার ঘরে ফিরতে চায়—তখন তাদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় কেন ভালোবাসার টানে ঘরে ফেরার এই যাত্রা এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে?”

মামুন বিশ্বাস আরও বলেন, “উত্তর মেলে না। ট্রাকের ছাদে বসে থাকা এই মানুষগুলোর চোখে ভেসে ওঠে একটাই ছবি, বাড়ির উঠোন, অপেক্ষায় থাকা প্রিয় মুখগুলো। সেই টানেই জীবনের সব ভয়কে পেছনে ফেলে তারা ছুটে চলে ঝুঁকির চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কাছে হার মানতে।”

হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, “ট্রাকের ছাদে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এমন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমরা প্রতিনিয়ত মহাসড়কে নজরদারি করছি এবং যাত্রীদের নিরাপদ যানে ভ্রমণের জন্য সচেতন করছি। কিন্তু যাত্রীদের অসচেতনতা ও পরিবহন সংকটের কারণে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁঁকি এড়াতে যাত্রীদের ট্রাক বা মালবাহী যানবাহনে না ওঠার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  ঈদুল ফিতর   বাসের বিকল্প ট্রাক   নাড়ির টান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close