মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
দেশজুড়ে
ছয় লাখের বেশি মুসল্লির ঢলে ইতিহাস গড়ল শোলাকিয়া
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯ তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত।  

প্রতি বছর এ ঈদগাহ মাঠে আশপাশের জেলা ছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা ঈদের জামাতে অংশ নেন। ঈদ জামাতকে ঘিরে এবারও আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় চার স্তরের নিরাপত্তা। এ ঈদ জামাতে রেকর্ড ৬ লাখ মুসল্লি অংশ নেয়।

শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ৯টার আগেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সকাল ১০টায় ঈদের জামাত শুরুর আগে ঈদগাহ ময়দানের রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে ৩টি, ৩ মিনিট আগে ২টি ও ১ মিনিট আগে ১টি শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে নামাজ আরম্ভের ঘোষণা দেয়া হয়। জামাতে ইমামতি করেন জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। 

শোলাকিয়া মাঠে অনুষ্ঠিত এই ঈদ জামাতে এবার ৬ লাখেরও বেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছেন ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।

নামাজ শেষে মোনাজাতে ইমাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণ এবং বাংলাদেশসহ মুসলিম উম্মার শান্তি-শৃঙ্খলা, সমৃদ্ধি ও ঐক্য কামনাসহ বিশেষ দোয়া করা হয়। 

এ সময় লাখো লাখো মুসল্লিদের উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।

শোলাকিয়ার এই মিলনমেলা যেন শুধুই নামাজ নয়, হয়ে উঠেছে ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য আর বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আসলাম মোল্লা, জেলা পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং বিদেশ থেকে আগত মুসুল্লিরা এবার শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করেন।

এদিকে, নিরাপত্তার কারণে শোলাকিয়ায় ঈদগাহ মাঠে যাওয়ার শহরের বেশিরভাগ সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় মুসুল্লিরা চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার পায়ে হেটে শোলাকিয়ায় আসতে শুরু করে। চৈত্রের এই সময়ে অনুকূল আবহাওয়া ও বাতাসের কারণে সকাল সোয়া নয়টার দিকেই মাঠ কানায়-কানায় ভরে যায়। ময়দানের পাশাপাশি সড়ক, বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন বিল্ডিং, পুকুরের পারসহ বিভিন্ন স্থানে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যান মুসল্লিরা। 

ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ছয় লাখের বেশি মুসল্লির ঢল

ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ছয় লাখের বেশি মুসল্লির ঢল


দেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদের জামাত নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় স্থানীয় প্রশাসন। মোতায়েন করা হয় ১১০০ জন পুলিশ, র‍্যাবের ৬টি টিম (প্রতি টিমে ৬ জন করে), ৫ প্লাটুন বিজিবি, ৪ প্লাটুন সেনাবাহিনী ও ৫ প্লাটুন আনসার সদস্য কাজ করে। 

এছাড়াও নিরাপত্তায় মাঠে ৪টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের মাধ্যমে আগত ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। মাঠের ভেতর-বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তায় ছিল বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবক দল। নিরাপত্তার স্বার্থে জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া আর কিছু সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। মাঠসহ আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। মুসল্লিদের যাতায়াত সুবিধার্থে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করে।

শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করতে গতকাল শুক্রবার থেকে নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, নোয়াখালী, যশোরসহ ৬৪টি জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে কিশোরগঞ্জে লোক আসতে শুরু করে। অনেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায়, আবাসিক হোটেল, শহরের মসজিদগুলোতে এবং ঈদগাহ মাঠে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়ে রাত যাপন করেন। ভোররাতে ট্রেন, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, রিকশা, মোটরসাইকেল, সাইকেল ও হেঁটে হাজারো মানুষ কিশোরগঞ্জে আসেন। সবার গন্তব্য ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান।

গাজীপুর কাপাসিয়া থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে আসা ইমন হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগের রাত্রেই বাবার সঙ্গে কিশোরগঞ্জে চলে আসছি। আমরা আমাদের আত্মীয়ের বাসায় ছিলাম রাতে। প্রতিবছরই আমি বাবার সঙ্গে শোলাকিয়া ঈদগাহে নামাজ আদায় করে আসি। আল্লাহ যতদিন জীবিত রাখবেন, চেষ্টা করব শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে অংশ নিতে।’

ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ছয় লাখের বেশি মুসল্লির ঢল

ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ছয় লাখের বেশি মুসল্লির ঢল


ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে নামাজ পড়তে আসা সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘একাধিকবার নিয়ত করেছি শোলাকিয়ায় নামাজ পড়ব, আসা হয়নি। আল্লাহতলা এবার মনের বাসনা পূরণ করেছে। বিশেষ ফরিয়াদ নিয়ে এখান এসেছি। নিশ্চয় আলাহ কবুল করবে।’

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘খুব সুন্দরভাবেই দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ঈদগাহ মাঠের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকলেই আমাদের সহযোগিতা করছেন। রাস্তা ঘাটে মানুষে লোকারণ্য। নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। আশা করছি, সকলেই শান্তিপূর্ন ভাবেই বাসায় ফিরতে পারবেন।’

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুসল্লিরা যেন নিরাপদে ও সহি-সালামতে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। পুরো ঈদ জামাত নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং কোথাও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ঈদ জামাত শেষে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘দেশের ঐতিহ্যবাহী এই বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত গর্বের বিষয়।’

তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন। শোলাকিয়া ঈদগাহ সংস্কার করার জন্য সরকার প্রধানের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্প নেওয়া, বড় ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করার আশ্বাস দেন। 

তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে কথা বলে শোলাকিয়াকে আরও বৃহৎ ও সৌন্দর্য বর্ধনের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন বলে তার বক্তব্যে বলেন। 

কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো মাজহারুল ইসলাম বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে মাঠের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হবে। জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল বলেন, দৃষ্টিনন্দন বিশাল তোরণ জেলা পরিষদ থেকে করে দেওযা হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের নামাজ চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গিদের অতর্কিত হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ নিহত হন চারজন। সেই থেকে ঈদ জামাতে বাড়তি নিরাপত্তার ওপর জোর দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে এই মাঠে ঈদের জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়া লাখিয়া’। যা এখন শোলাকিয়া নামেই পরিচিত। তবে শোলাকিয়া মাঠের ঐতিহ্য ও সুনাম অনুযায়ী এ মাঠের উন্নয়ন হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয় লোকজন। 

তাদের দাবি, ঐতিহাসিক এই ঈদ জামাতকে যেন দেওয়া হয় ইউনেস্কো স্বীকৃতি।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  শোলাকিয়া   ঈদের জামাত   মুসল্লি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close