মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মাথাচাড়া দিচ্ছে চরমপন্থিরা
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ৮:৩৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চরমপন্থিরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র দলগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থিরা ফের সংগঠিত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো কোনো অঞ্চলে এসব নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের দেয়াললিখন ও পোস্টার দেখা গেছে। অনেক বছর ধরে তাদের তৎপরতা ছিল না। হঠাৎ পোস্টার লাগানো ঘিরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, গোপনে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তারা।এমন প্রচারণার মাধ্যমে তারা প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে এবং সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করছে। যদিও এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চরমপন্থিদের নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরমপন্থা হলো সমাজ বা রাজনীতির মূলধারার বাইরে গিয়ে চরম, কট্টর বা চরমপন্থী পদক্ষেপ ও মতাদর্শের সমর্থন। এই মতাদর্শগুলো সাধারণত কেন্দ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে থাকে এবং চরমপন্থী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কট্টরপন্থী বা বিপ্লবী হতে পারে। চরমপন্থী বা কট্টরপন্থী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই সহিংসতার আশ্রয় নেয়, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অবৈধ কাজ করে। এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় হুমকি।

সম্প্রতি পুনরুত্থানের ইঙ্গিত

পাবনায় এক দশকেরও বেশি সময় পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) দেয়াললিখন ও পোস্টার দেখা গেছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এ ধরনের তৎপরতা চরমপন্থী সংগঠনের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, ঈদের দিন রাতে আতাইকুলা থানা এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে সর্বহারার সমাজতন্ত্র কায়েমের পাশাপাশি স্থানীয় তাঁতশিল্প রক্ষার কথা বলা হয়েছে। গত রোববার সকাল থেকে একদন্ত, লক্ষ্মীপুর, বৃহস্পতিপুর, ভুলবাড়িয়া, তেবাড়িয়া, শ্রীপুর, শিবপুর, শরৎগঞ্জ, ধানুয়াটা, বালুঘাটা, আয়েনগঞ্জ, হাদল, ধূলাউড়ীসহ বিভিন্ন বাজারে এই পোস্টার দেখা যায়।

সরেজমিনে আতাইকুলা থানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, থানা এলাকার বিভিন্ন দোকান, দেয়াল ও জনসমাগমস্থলে লাল রঙের এসব পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে ‘দুনিয়ার সর্বহারা এক হও’ স্লোগানের পাশাপাশি সাম্যবাদী আদর্শ প্রচারের বিভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্ট্যালিন এবং মাও সেতুংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

পোস্টারগুলোতে ‘বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, সমাজতন্ত্র কায়েম করো’, ‘লাঙল যার জমি তার, জাল যার জলা তার’, ‘বিদেশি কাপড় বন্ধ করো, তাঁতশিল্প রক্ষা করো’, ‘রং সুতার অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করো, করতে হবে’—এমন ধরনের উসকানিমূলক লেখা রয়েছে। পোস্টারের নিচে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) নাম উল্লেখ রয়েছে। এই সংগঠন অতীতে চরমপন্থী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, রাতের আঁধারে এসব পোস্টার লাগানো হয়েছে। সকালে উঠে এগুলো দেখার পর থেকেই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুরোনো রক্তক্ষয়ের দিনের কথা মনে করে তারা আতঙ্কিত।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে সকালে ঘুম থেকে উঠেই মার্ডারের খবর শুনতে হতো। ওই দিন আর চাই না আমরা।’

সংগঠনটির এক কর্মী বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই তারা আবারও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক বছর ধরে এলাকায় তাদের তৎপরতা ছিল না। হঠাৎ পোস্টার লাগানো ঘিরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, গোপনে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আগে এই সংগঠনের কারণে এলাকায় শান্তি ছিল না। চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ—সবকিছু ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক বছর ভালো ছিলাম, শান্তিতে ছিলাম। হঠাৎ এই পোস্টার দেখে আবার রাতে ঘুম হচ্ছে না। আবার কী সেই দিন ফিরে আসবে? আবার কী আমাদের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে—এসব ভেবে আতঙ্কে আছি।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুলসংখ্যক সদস্য আত্মসমর্পণ করায় সংগঠনটি প্রায় নেতৃত্বশূন্য ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল।

দলের আত্মসমর্পণ করা এক কর্মী বলছিলেন, ‘আমরা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছি। স্বাভাবিক কাজকর্ম করে চলছি। আর ওই অন্ধকার জগতে ফিরতে চাই না। ওই সময়ে সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তায় আমরা বর্তমানে ভালো আছি।’

এ বিষয়ে আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘পোস্টারিংয়ের খবর পাওয়ার পর আমি থানা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো কোনো অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না। কারা এই পোস্টারিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।’ পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে যারা পোস্টার লাগিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় লুট হওয়া অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। পাড়া-মহল্লার সন্ত্রাসীদের হাত ঘুরে নব্য চরমপন্থীদের হাতে চলে এসেছে এসব অস্ত্র। অস্ত্রধারীদের আনাগোনা বেড়েছে। ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

চরমপন্থীরা আগের অবস্থায় ফিরছে

বিগত সময়ে আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থীরা ফের সশস্ত্র অবস্থায় ফিরছে বলে জানিয়েছে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাব। অস্ত্রসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিতে সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন র‌্যাব-১২ অধিনায়ক আতিকুর রহমান মিয়া। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাকিব রানা (৫৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে চারটি রাইফেল, পাঁচটি একনালা বন্দুক, দুটি শটগান, একটি পিস্তলসহ ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৯৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।’ র‌্যাব-১২ অধিনায়ক আতিকুর রহমান বলেন, এরা চট্টগ্রাম থেকে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করে ঢাকার আদাবরে নিয়ে রাখে।

পরে সুযোগমতো পাবনায় চরমপন্থীদের কাছে পাঠায়। তিনি বলেন, ‘চর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চরমপন্থীরা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে, যারা এর আগে আত্মসমর্পণ করে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের ব্যাপারে র‌্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

কীভাবে টিকে আছে সর্বহারা বা চরমপন্থীরা

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপরই সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, মেহেরপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী এলাকায় ঘাঁটি তৈরি করেছিল বামপন্থি-চরমপন্থীরা। মার্কস-লেনিন বা মাওবাদী আদর্শের নামে সেই সময় ওই এলাকায় ১৫টির বেশি সংগঠন ছিল। তাদের নিজেদের মধ্যে যেমন সহিংসতা হতো, তেমনি সাধারণ অনেক মানুষ এসব বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।

গত দুই দশক ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থীদের দমন করতে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। এতে এসব দলের শীর্ষ অনেক নেতা নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে র‌্যাব গঠন হওয়ার পর নিয়মিত অভিযান চালানো শুরু হলে এসব দলের অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে যান।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নানা নামে এসব সংগঠন চাঁদাবাজি, হত্যা, ডাকাতির মতো নানা অপরাধ করছে। গত ২০ বছরে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া এলাকায় এসব সংগঠনের হাতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাবনার স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, গত এক দশক ধরে প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে একাধিক চরমপন্থি দলের সক্রিয় থাকার তথ্য শোনা যায়।

বিশেষ করে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দুর্গম বিল বা চরাঞ্চল, টাঙ্গাইলের জঙ্গল এলাকাগুলোয় এদের তৎপরতা বেশি। মাঝে মাঝে নানা সংগঠনের ব্যাপারে হামলা বা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও ওঠে। সহজে অর্থ লাভের আশায় প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর অনেক বাসিন্দা এসব সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

কেন পুরোপুরি দমন হচ্ছে না

২০০৪ সালে র‌্যাব গঠন হওয়ার পর থেকে তারা পুরোদমে চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। সেই সময় দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোয় র‌্যাব ও পুলিশের হাতে বিভিন্ন চরমপন্থি দলের কয়েকশ সদস্য নিহত হয়। এসব বাহিনী দাবি করেছে, তারা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, যেভাবে চরমপন্থীদের দমন করার চেষ্টা করা হয়, সেটা ফলপ্রসূ না হওয়ার কারণেই এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, আত্মসমর্পণের কিছুদিন পরে অনেকে পুনরায় চরমপন্থি দলে ফিরে গেছেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  মাথাচাড়া   চরমপন্থিরা   বিএনপি   আওয়ামীলীগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close