মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
২৫শে মার্চের কালরাত্রি : ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা
ওসমান গনি
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১১:১২ এএম আপডেট: ২৫.০৩.২০২৬ ১১:২৭ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইতিহাসের পাতায় কিছু তারিখ থাকে যা শুধু সময় নির্দেশ করে না, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের মানচিত্র এবং গন্তব্য চিরতরে বদলে দেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তেমনই এক ভয়াল, বীভৎস ও রক্তস্নাত রাত, যা বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল এক দাউ দাউ করে জ্বলা ক্ষত হয়ে থাকবে। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসেও সেই রাতের নিকষ কালো অন্ধকার আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে অমলিন। একাত্তরের সেই বসন্তের রাতটি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর লগ্ন ছিল না, সেটি ছিল আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম এবং পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক সেই সামরিক অভিযানের আড়ালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন নিরস্ত্র, ঘুমন্ত ও নিরপরাধ বাঙালির ওপর যে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছিল, তার সমান্তরাল কোনো উদাহরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিরল। এটি ছিল একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, যার মূল লক্ষ্য ছিল একটি জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে বুলেটের স্তূপের নিচে চিরতরে কবর দেওয়া এবং একটি জাতিকে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেওয়া।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকেই পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা জমছিল। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থান্বেষী সামরিক ও রাজনৈতিক শাসকচক্র।

একদিকে আলোচনার টেবিলে সমঝোতার কৃত্রিম নাটক চলছিল, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে করাচি থেকে জাহাজে করে আসছিল মারণাস্ত্র আর সৈন্য। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, যখন ঘরে ঘরে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই ২৫শে মার্চের গভীর রাতে জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশে শুরু হয় সেই বর্বরোধ্য নিধনযজ্ঞ। পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুরান ঢাকার জনবহুল অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ ভেসে গিয়েছিল রক্তের বন্যায়। ট্যাঙ্কের কর্কশ গর্জন আর ভারী মেশিনগানের অবিরাম গুলির শব্দে সেদিন ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। হায়েনারা সেদিন শুধু সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনীকে আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত সাধারণ মানুষের ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্রদের টেনে বের করে জঘন্যভাবে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়েছিল। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং রোকেয়া হলে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। শিক্ষকদের বাসভবনে ঢুকে মেধাবী মণীষীদের হত্যা করা হয়েছিল শুধু তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ধারণ করতেন বলে। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. জি সি দেবের মতো মহান শিক্ষকেরা সেদিন ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

অন্যদিকে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে বের হওয়ার পথে বন্দুক তাক করে রাখা হয়েছিল, যাতে কেউ জীবন্ত বাঁচতে না পারে। বুড়িগঙ্গার জল সেদিন লাশে লাশে ভরে উঠেছিল, আর রক্তের লাল রঙে নদীর জল তার স্বাভাবিকতা হারিয়েছিল। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরের মতো বড় শহরগুলোতেও একই কায়দায় চালানো হয়েছিল ধ্বংসলীলা।

এ গণহত্যার গভীরতা ও ভয়াবহতা অনুধাবনের জন্য আমাদের বিশ্ববিবেকের দর্পণের দিকে তাকাতে হয়। বিদেশি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস কিংবা আর্চার ব্লাডের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে সেই বীভৎসতা। যেখানে একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী তাদেরই দেশের (তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে) করদাতা নাগরিকদের ওপর বিদেশি শত্রুর মতো মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্ট্যানলি উলপার্টের মতো ঐতিহাসিকেরা একে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

পাকিস্তানের শাসকেরা ভেবেছিল, ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে এবং কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করে তারা সাত কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে স্তব্ধ করে দিতে পারবে। তারা মনে করেছিল, বাঙালির মেরুদণ্ড একবার ভেঙে দিতে পারলে তারা আরও কয়েক দশক শোষণ চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু সামরিক জান্তা ইতিহাসের এক পরম ধ্রুব সত্য বিস্মৃত হয়েছিল, দমন-পীড়ন আর বন্দুকের নল দিয়ে কোনো আত্মমর্যাদাশীল ও মুক্তিকামী জাতিকে চিরকাল দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা যায় না।

২৫শে মার্চের সেই অগ্নিঝরা রাতেই বাঙালির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক অপ্রতিরোধ্য সংকল্পে রূপান্তরিত হয়। মধ্যরাতের সেই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক পরেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন। তার সেই সংক্ষিপ্ত অথচ বজ্রকঠিন ঘোষণা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তটি ছিল বাঙালির জন্য এক মহাসন্ধিক্ষণ।

একদিকে প্রিয়জনের লাশের স্তূপ আর আগুনের লেলিহান শিখা, অন্যদিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত আহ্বান। পাকিস্তানের শাসকেরা যখন মনে করেছিল তারা বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করছে, তখনই প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে এক একটি অদৃশ্য দুর্গ গড়ে উঠেছিল। সেই রাতের অন্ধকারই আসলে বাঙালির জন্য নতুন সূর্যোদয়ের অবিনাশী পটভূমি তৈরি করেছিল। গণহত্যা যেখানে স্থবিরতা বা আতঙ্ক আনার কথা ছিল, সেখানে তা এনেছিল তীব্র এক গতিময়তা ও প্রতিশোধের নেশা।

২৫শে মার্চের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলার ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পুলিশ ও সেনাসদস্যরা দলমত নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান। যার যা কিছু ছিল, লাঠি, বল্লম থেকে শুরু করে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, তাই নিয়ে তারা আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সেই রাতের বিভীষিকা রূপান্তরিত হয়েছিল রণাঙ্গনের অসীম বীরত্বে। বাঙালির দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের নৈতিক ও আত্মিক ভিত্তিপ্রস্তর মূলত সেই রক্তস্নাত রাতেই প্রোথিত হয়েছিল। গ্রামের সাধারণ কিশোর থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত যুবক, সবার চোখে তখন একটাই স্বপ্ন, একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, যেখানে আর কোনো কালরাত্রির ভয় থাকবে না।

২৫শে মার্চের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী জনমত গঠিত হতে শুরু করে এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করে। এটি শুধু একটি ভূখণ্ডের লড়াই ছিল না, এটি ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের এক মহাকাব্যিক লড়াই।

আজ যখন আমরা ২৫শে মার্চের কালরাত্রিকে স্মরণ করি, তখন এটি শুধু কান্নার বা শোক প্রকাশের উপলক্ষ থাকে না; বরং এটি আমাদের জাতীয় চেতনার শাণিত রূপ এবং আত্মপরিচয়ের এক অটল স্তম্ভ হিসেবে দেখা দেয়। এ দিনটি বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রকৃত কুৎসিত ও ফ্যাসিবাদী চেহারাটি চিরতরে উন্মোচন করে দিয়েছিল। এটি ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক চরম নৈতিক ব্যর্থতা, যেখানে স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে অনেক বৃহৎ শক্তি নীরব ছিল কিংবা পরোক্ষভাবে ঘাতকদের মদদ দিয়েছিল।

তবে বাঙালির হিমালয়সম ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিল। কালরাত্রির সেই বিভীষিকা জয় করেই আমরা অর্জন করেছি বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের নিজস্ব ঠিকানা, লাল-সবুজের পতাকা। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে কেনা এই স্বাধীনতা আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করার অমর পাঠ।

ইতিহাসের এই নির্মমতম অধ্যায় বর্তমান এবং অনাগত প্রজন্মের কাছে এক মহান ও পবিত্র দায়বদ্ধতা। যে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই মূল্যবোধকে হৃদয়ে লালন করা এবং রক্ষা করাই হোক আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের শপথ। ২৫শে মার্চের সেই আগুনের উত্তাপ যেন আমাদের দেশপ্রেমকে সবসময় জাগ্রত রাখে এবং যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা যোগায়। শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র পথ হলো একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কালরাত্রির সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অন্ধকার পেরিয়ে যে ভোরের রক্তিম সূর্য আমরা ছিনিয়ে এনেছি, তার তেজ যেন কোনো অপশক্তির ছায়ায় কোনোদিন মøান না হয়।

২৫শে মার্চের ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জন বীরত্বের কাজ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তার চেয়েও বড় কঠিন সাধনা। সেই অগ্নিজাগরণের অবিনাশী চেতনা বুকে ধারণ করে আমরা এগিয়ে যাব আগামীর পথে, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের জয়গান হবে শাশ্বত। আমাদের উত্তরসূরিরা যেন এই রক্তরাঙা ইতিহাস থেকে সাহস সংগ্রহ করে এবং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি আমাদের শোকাতুর করে ঠিকই, কিন্তু সেই শোকই আজ আমাদের পরম শক্তি।


লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  ২৫শে মার্চ   নৃশংসতম   গণহত্যা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close