ইরান যুদ্ধকে পুঁজি করে দেশের তেলের বাজারে চলছে ব্যাপক নৈরাজ্য। সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে মিলছে না তেল। অভিযোগ রয়েছে অতি লাভের আশায় তেল মজুত করছেন পাম্প মালিকরাও। এ ছাড়া তেল কালোবাজারিরও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে তেল বিতরণে রয়েছে তদারকির অভাব।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়েই তেল সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সংকট নিরসনে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে সে উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। বিশ্লষকরা এ বিষয়ে মাঠপ্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা আরও বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী গোপনে তেল মজুত করেছন। তাদের প্রত্যাশা যুদ্ধ আরও দীর্ঘাায়িত হলে সরকার জ¦ালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। আর তারা সেই সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের এ অতি মুনাফার লোভ দেশকে জ¦ালানি সংকটের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
যদিও দেশে এ মুহূর্তে জ্বালানি সংকট নেই বরে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসায় বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন অস্থিতিশীল।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং খাতটিকে একটি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।’
‘এ মুহূর্তে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানির দামে এখনো বেশ পার্থক্য রয়েছে।
আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তথ্যমন্ত্রী।
পাম্পের তেল চলে যাচ্ছে কালোবাজারে :
তেলের জন্য পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকলেও মিলছে না তেল। তবে অভিযোগ করেছে পাম্প মালিকরা গোপনে বেশি দামে খোলা বাজারে তেল বিক্রি দিচ্ছেন। গত মঙ্গলবার জামালপুর সদর উপজেলায় কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে পরিবহনকালে তিন হাজার লিটার পেট্রোলসহ ১১ জন আটক হয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের আটকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এদিন মধ্যরাতে উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কালিবাড়ি বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মধ্যরাতে কয়েকটি যানবাহনে করে তেলের ড্রাম নিয়ে যাওয়ার সময় বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। সন্দেহ হলে যানবাহনগুলো থামানো হয়। তাতে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল দেখতে পেয়ে চালকসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশে দেন স্থানীয়রা। এ সময় পুলিশ একটি পিকআপ ভ্যান, একটি ভটভটি, একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও একটি অটোরিকশায় থাকা ১৫টি ড্রাম থেকে মোট তিন হাজার লিটার পেট্রোল জব্দ করে।
জানা গেছে, পাম্প মালিকদের কাছ থেকে বেশি দামে পেট্রোল কিনে খোলা বাজারে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্যেশ্য ছিল আটকদের।
জানা গেছে, উত্তরবঙ্গের বেশির ভাগ এলাকা ও চট্টগ্রামের দুই তৃতীয়াংশ পেট্রোল-অকটেন ও ডিজেল পাম্প এখনো বন্ধ। শুধু গাড়ির ক্ষেত্রে নয়, সাগরে মেরিন ফুয়েল সংকটে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা বিদেশি মাদার ভ্যাসেল, জেট ফুয়েল সরবরাহ সংকটে বিমান বন্দরে শত শত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিলের খবর প্রচার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জনমনে চরম অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
সরকার ও বিপিসি বলছে, দেশে এখনো কোনো রকম জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে জ্বালানি সাশ্রয়ে শুধু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিপিসির তথ্যমতে, জাহাজগুলো থেকে খালাস করা জ্বালানি সরাসরি চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ডিপোগুলোতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেখান থেকে পাইপলাইনে দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন ডিপোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিপো থেকে ডিলারের মাধ্যমে দেশের সবকটি ফিলিং স্টেশনে পাঠানো হচ্ছে। ফলে দেশে এখনো কোনোরকম জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি।
বিপিসির গণসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মনিলাল দাশ বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর আগের মতোই সবকটি ফিলিং স্টেশন ডিলারদের নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমরা শুনতে পাচ্ছি দুই তৃতীয়াংশ ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ। তবে আমরা গেলে দেখা যায় তারা তেল বিক্রি করছে। মনে করা হচ্ছে-দাম বাড়ার লোভে ডিলার এবং ফিলিং স্টেশনের মালিকরা কোনোরকম কারসাজি করে তেল মজুত করে তালগোল পাকাচ্ছে।
এদিকে ডিলারদের ভাষ্য, ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ না বাড়ানোয় জ্বালানি তেলের সংকট কাটছে না। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এখনো আগের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে, পাম্প মালিকদের অভিযোগ, রেশনিং তুলে নেওয়ার ঘোষণা বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম সরবরাহ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক পাম্প বাধ্য হয়ে বিক্রি বন্ধ রাখছে।
কেকে/এমএ