সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভর্তিযুদ্ধের অবসান, প্রয়োজন টেকসই বিকল্প ও সমতা
মো. জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:৩২ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একরাশ বইয়ের ভারে নুয়ে পড়া শরীর আর সেই ভারের নিচে চাপা পড়া একজোড়া বিষণ্ন চোখ— এ যেন বর্তমান শৈশবের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। কাঁধের ঝোলায় আনন্দগুলো বিসর্জন দিয়ে শিশুটি আজ শৈশবের সহজ পাঠ ভুলে ছুটছে কোচিং সেন্টারের যান্ত্রিকতায়। যেখানে ঘাসের বুকে ফড়িং ধরার কথা ছিল, সেখানে আজ সে দৌড়াচ্ছে এ প্লাস আর সেরা স্কুলের মরীচিকার পেছনে। আমরা কি মেধা খুঁজছি, নাকি প্রতিযোগিতার এ জাঁতাকলে পিষ্ট করে একটি প্রজন্মের সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করছি?

ভর্তিপরীক্ষা শব্দটির সঙ্গে যুদ্ধ শব্দটি আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এ যুদ্ধ শুধু শিশুর নয়, বরং পুরো পরিবারের। ৫ বা ৬ বছরের একটি শিশুকে যখন কয়েক হাজার প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়তে পাঠানো হয়, তখন তার কোমল মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা বা চরম প্রতিযোগিতার বিষবাষ্প ঢুকে পড়ে। ইউনিসেফ এবং বিভিন্ন শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশবে অত্যধিক মানসিক চাপ শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। 

যেমন— ছয় বছর বয়সি সাজিদ এ বাস্তবতার এক উদাহরণ। প্রতিদিন সে সকাল ৬টায় উঠে বই নিয়ে কোচিং সেন্টারে যায়। তার স্কুলের পাশের খোলা মাঠে বন্ধুরা খেলা করছে, প্রজাপতি ধরছে, কিন্তু সাজিদের সেই আনন্দের কিছুই দেখা যায় না। কোচিং শেষে ঘরে ফিরে রাত ৯টা পর্যন্ত হোমওয়ার্ক করতে হয়। পরীক্ষার ফলাফলের চাপ এবং অভিভাবকের উচ্চ প্রত্যাশার কারণে সাজিদ প্রায়ই ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে তার চোখে শিশুমনের কৌতূহল কমে যাচ্ছে, আর সৃজনশীলতার পরিবর্তে শুধুই সঠিক উত্তর দেওয়ার মানসিকতা জন্ম নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ওচএ (OCHA)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি শিশু মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে, যাদের আমরা মানবিক সংকটের বাইরে বলে মনে করি, সেই শিশুদের মধ্যেও একটি বড় অংশ মানসিক চাপের মধ্যে বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বয়সি অনেক শিশু অতিরিক্ত একাডেমিক চাপের কারণে মানসিক ও সামাজিক বিকাশে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ঢাকার শীর্ষস্থানীয় স্কুলগুলোর ভর্তি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি আসনের বিপরীতে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ জন শিশু প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ভর্তির সুযোগ পায় মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ। ফলে বাকি ৯৫ শতাংশ শিশু শুরুতেই ব্যর্থতার এক গভীর গ্লানি নিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করে। এ তথাকথিত ‘ব্যর্থতা’ তাদের মনে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি করেÑ তারা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, মেধা যাচাইয়ের এ প্রক্রিয়াটি নিজেই কতটা ত্রুটিমুক্ত?

ভর্তিপরীক্ষা বনাম লটারি : একটি বিতর্ক

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। এ পদ্ধতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও এর একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো— এটি কোচিং বাণিজ্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে এবং শিশুদের ওপর থেকে পরীক্ষার মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়েছে।

তবে লটারির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, এতে মেধাবী শিশুরা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে— ৫-৬ বছর বয়সে ‘মেধা’ বলতে আমরা আসলে কী বোঝাতে চাই? মুখস্থ করার ক্ষমতা, নাকি দ্রুত উত্তর দেওয়ার কৌশল? লটারি অন্তত এ অমানবিক প্রতিযোগিতার হাত থেকে শিশুদের কিছুটা হলেও মুক্তি দিয়েছে, যদিও এটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। কারণ এ ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি, স্কুলগুলোর মানে যদি বড় ধরনের বৈচিত্র্য থাকে, তবে শুধু লটারির মাধ্যমে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কোচিং বাণিজ্য ও পারিবারিক সংকট 

ভর্তিপরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার কোচিংবাণিজ্য। অভিভাবকরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করছেন সন্তানের ভর্তির পেছনে। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা সন্তানকে ব্যয়বহুল কোচিংয়ে পাঠাতে পারছেন; আর যারা পিছিয়ে পড়া, তাদের সন্তানরা শুরুতেই প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে ছিটকে পড়ছে।

এটি কি শিক্ষার মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? শিক্ষা তো হওয়ার কথা ছিল সাম্যের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ভর্তিপরীক্ষা শুধু একটি শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি positional competition বা অবস্থানভিত্তিক প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। যেখানে শিশুর প্রকৃত দক্ষতা নয়, তার পারিপার্শ্বিক সুবিধা— যেমন দামি কোচিং, অভিভাবকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা-ই প্রাধান্য পায়। ফলে আমাদের মানবসম্পদ যথাযথভাবে বিকশিত হতে পারছে না। এই shadow education বা কোচিং অর্থনীতি শুধু শিশুর মানসিক চাপ বৃদ্ধি করছে না, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়াচ্ছে, কারণ সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্র অভিজাত ও ধনসম্পন্ন পরিবারের শিশুদের পক্ষে সহজ হয়ে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : তারা কীভাবে সফল?

ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নেই। ফিনল্যান্ডে প্রতিটি স্কুলই মানসম্মত এবং শিশুরা তাদের বাড়ির পাশের স্কুলেই ভর্তি হয়। সেখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতা এবং সামাজিকীকরণ। তাদের এ মডেলে কোনো শিশু নিজেকে অযোগ্য মনে করে না। আমাদের দেশেও যদি এলাকাভিত্তিক স্কুলিং ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করা যেত, তবে আজকের এ ভর্তিযুদ্ধ শব্দটির অস্তিত্ব থাকত না। তবে তাদের সফলতার মূল চাবিকাঠি শুধু ভর্তি পদ্ধতির ভিন্নতা নয়, বরং প্রতিটি স্কুলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কার্যকর সমতা প্রতিষ্ঠা, অর্থাৎ তারা পদ্ধতি নয়, পুরো ব্যবস্থাকেই সমানভাবে শক্তিশালী করেছে।

বাস্তবমুখী বিকল্পের সন্ধান

ভর্তিযুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সর্বপ্রথম, এলাকাভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি স্কুলের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে দিলে সে এলাকার শিশুরা সংশ্লিষ্ট স্কুলে অগ্রাধিকার পাবে। এতে একদিকে যেমন যানজট কমবে, অন্যদিকে স্কুলে স্কুলে মানের বৈষম্যও ধীরে ধীরে কমে আসবে। একইসঙ্গে দেশের প্রতিটি স্কুলের মান উন্নয়নে জোর দিতে হবে। রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে না ছুটে প্রতিটি স্কুলে সমমানের অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে অভিভাবকদের নির্দিষ্ট কিছু স্কুলের প্রতি অন্ধ মোহ অনেকটাই কমে যাবে। এ ছাড়া মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যদি পরীক্ষা নিতেই হয়, তবে তা খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুর আচরণ, আগ্রহ ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। পাঁচ বছরের একটি শিশুর বর্ণমালা জ্ঞান যাচাইয়ের চেয়ে তার যোগাযোগ দক্ষতা বা দলীয় কাজে অংশগ্রহণের মানসিকতা মূল্যায়ন করাই অধিক যৌক্তিক।

পাশাপাশি, লটারি পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা যেতে পারে। এর সঙ্গে শিশুর বাসস্থানের দূরত্বের ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পয়েন্ট সিস্টেম যুক্ত করলে সমতা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বাড়বে।

তবে এসব প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো— স্কুলের মানে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করা। যতদিন কিছু নির্দিষ্ট স্কুল ‘সেরা’ আর বাকিগুলো ‘বিকল্প’ হিসেবে বিবেচিত হবে, ততদিন ভর্তিযুদ্ধ কোনো না কোনো রূপে থেকেই যাবে। তাই ভর্তি পদ্ধতির পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিটি স্কুলে সমমানের অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর। এ সমতা প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিযোগিতার অস্বাস্থ্যকর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে এবং ভর্তি ব্যবস্থা ঘিরে বর্তমান সংকটও অনেকাংশে নিরসন সম্ভব হবে।

সর্বোপরি বলব এ দায় আমাদের সবার, আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু একটি ভালো ফলাফল দেওয়া যন্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, নাকি একজন সুস্থ ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে? ভর্তি পরীক্ষার এ বোঝা আসলে আমাদের ব্যর্থতারই নামান্তর। আমরা প্রতিটি শিশুকে সমান সুযোগ দিতে পারছি না বলেই তাদের যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দিচ্ছি। শৈশব একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। শিশুদের শৈশব কেড়ে নিয়ে আমরা যদি তাদের তথাকথিত মেধাবী বানাতে চাই, তবে সেই মেধা দেশের খুব একটা উপকারে আসবে না। সময় এসেছে এ অসুস্থ প্রতিযোগিতার অবসান ঘটিয়ে একটি মানবিক ও বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করার। যেখানে প্রতিটি শিশু হাসি মুখে স্কুলে যাবে এবং নিজেকে সফল মনে করার অধিকার নিয়ে বড় হবে।

লেখক : শিক্ষক, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ

কেকে/এসএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভর্তি    ভর্তি পরীক্ষা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close