বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একসময় ছিল গৌরবের প্রতীক। বিশেষ করে সরকারি স্কুলগুলো — যেগুলো থেকে বের হয়ে এসেছে দেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী, নেতৃত্ব দিয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক অদৃশ্য পরিবর্তন ঘটেছে। আজ অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। বরং তারা ঝুঁকছেন বেসরকারি বা প্রাইভেট স্কুলের দিকে। প্রশ্ন হচ্ছে — কেন এই আস্থাহীনতা তৈরি হলো? কোথায় সমস্যার মূল?
শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি স্কুলগুলোতে পাঠদান প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না। শিক্ষকরা হয়তো যোগ্য, কিন্তু নানা প্রশাসনিক চাপ, অতিরিক্ত দায়িত্ব কিংবা পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাবে শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা ও গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রাইভেট স্কুলগুলোতে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও মূল্যায়নের একটি সুসংগঠিত কাঠামো থাকে, যা অভিভাবকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয়। জবাবদিহিতার অভাব একটি বড় সমস্যা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় শিক্ষক বা প্রশাসনের উপর যথাযথ নজরদারি থাকে না। ক্লাস নিয়মিত হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা সময়মতো আসছেন কি না — এসব বিষয় অনেক সময় অবহেলিত থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে, বেসরকারি স্কুলগুলোতে অভিভাবকরা সরাসরি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন এবং দ্রুত সমাধান পান, যা তাদের আস্থা বাড়ায়।
অবকাঠামোগত দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দেশের অনেক সরকারি স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষার্থীদের বসার সঠিক ব্যবস্থা নেই, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী বা প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। কোথাও কোথাও টয়লেট বা পরিচ্ছন্নতার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। অভিভাবকরা স্বাভাবিকভাবেই চান তাদের সন্তান একটি নিরাপদ, পরিষ্কার এবং আধুনিক পরিবেশে পড়াশোনা করুক। এই ক্ষেত্রে প্রাইভেট স্কুলগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে।
ইংরেজি মাধ্যম বা আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত। অনেক সরকারি স্কুলে এখনো ইংরেজি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাইভেট স্কুলগুলোতে ইংরেজি মাধ্যম বা ইংরেজি-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থাকায় অভিভাবকরা মনে করেন, তাদের সন্তান ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাসের বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে প্রাইভেট স্কুলে পড়া একটি ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকরা মনে করেন, ভালো প্রাইভেট স্কুলে পড়ালে সমাজে তাদের একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। ফলে শিক্ষার মানের পাশাপাশি সামাজিক ভাবমূর্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
কোচিং নির্ভরতা সরকারি শিক্ষার উপর আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, শুধুমাত্র সরকারি স্কুলে পড়ে ভালো ফলাফল করা কঠিন; তাই কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এতে অতিরিক্ত খরচ ও চাপ বাড়ে। অন্যদিকে, অনেক প্রাইভেট স্কুল নিজেদের মধ্যেই অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস বা গাইডেন্স প্রদান করে, যা অভিভাবকদের কাছে সুবিধাজনক মনে হয়।
শিক্ষকদের প্রেরণা ও পেশাগত উন্নয়নের অভাবও একটি কারণ। সরকারি স্কুলের অনেক শিক্ষকই দক্ষ ও অভিজ্ঞ, কিন্তু তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক পদ্ধতিতে আপডেট হওয়ার সুযোগ বা প্রণোদনা সীমিত। ফলে তারা নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণে পিছিয়ে পড়তে পারেন। এর বিপরীতে, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি — সব সরকারি স্কুলই খারাপ নয়, এবং সব প্রাইভেট স্কুলই ভালো নয়। এখনো অনেক সরকারি স্কুল আছে, যেখানে অত্যন্ত ভালো ফলাফল হচ্ছে, শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, এবং শিক্ষার্থীরা সফলতা অর্জন করছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কী করা যেতে পারে?
বাংলাদেশে সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা পুনর্গঠন করা একটি জটিল কিন্তু অত্যন্ত জরুরি কাজ। এটি শুধু শিক্ষা খাতের উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। তাই সমস্যার গভীরে গিয়ে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষার মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি স্কুলগুলোতে পাঠদান যেন শুধুমাত্র পাঠ্যবই পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা হয় দক্ষতা-ভিত্তিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক — এটি নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি যেমন-অ্যাক্টিভ লার্নিং, গ্রুপ ওয়ার্ক, প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা ইত্যাদি চালু করতে হবে। এর জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা নতুন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী মনিটরিং ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সরকারি স্কুলে নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকরা সময়মতো ক্লাস নিচ্ছেন কিনা, শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে শিখছে কিনা — এসব বিষয় কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি, ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং অবহেলার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও পেশাগত নিষ্ঠা বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিতে হবে। একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ পরিবেশ শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ায়। অনেক সরকারি স্কুলে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, ভালো আসবাবপত্র, পরিষ্কার টয়লেট এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। এসব মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, ডিজিটাল ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং ইন্টারনেট সুবিধা চালু করে শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী করে তুলতে হবে।
চতুর্থত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। তাই সরকারি স্কুলগুলোতে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ, ভাষা চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি এবং আইসিটি ল্যাব স্থাপন করতে হবে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে যে সরকারি স্কুলেও আধুনিক শিক্ষা সম্ভব।
পঞ্চমত, শিক্ষক সমাজকে আরও প্রণোদনা ও মর্যাদা দিতে হবে। শিক্ষকরা যদি আর্থিক ও পেশাগতভাবে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে তারা আরও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। এজন্য তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, গবেষণার সুযোগ এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে, নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ষষ্ঠত, অভিভাবক — বিদ্যালয় সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ দুর্বল থাকে। নিয়মিত অভিভাবক সভা, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা এবং অভিভাবকদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে একটি পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা যেতে পারে। যখন অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন, তখন তাদের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
সপ্তমত, কোচিং নির্ভরতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। স্কুলের মধ্যেই অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস, রিমিডিয়াল ক্লাস এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের বাইরে কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। এতে অভিভাবকদের অতিরিক্ত খরচ ও মানসিক চাপ কমবে, এবং তারা স্কুলের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠবেন।
অষ্টমত, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা খাতে ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সবশেষে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু প্রাইভেট স্কুলকে ‘ভালো’ এবং সরকারি স্কুলকে ‘খারাপ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সরকারি স্কুলের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে এবং সফল উদাহরণগুলো প্রচার করতে হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সরকারি স্কুলের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজ — সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।
লেখক: শিক্ষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ
কেকে/এলএ