দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবহন এবং জনজীবনের ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, সীমিত সরবরাহ, ‘অকটেন নেই’ সাইনবোর্ড — এসব দৃশ্য এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
ঈদ পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলে ফেরা মানুষ, পর্যটন খাত এবং পণ্য পরিবহন — সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। কক্সবাজারে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে মাছ ধরার প্রায় চার হাজার নৌযান সাগরে যেতে পারছে না। এতে স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহও কমে গেছে। এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে জেলা শহরের হোটেল-মোটেলগুলোতে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে পর্যটননগর কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের। তিন পার্বত্য জেলাতেও একই সংকটে পড়ছেন পর্যটকরা।
এই সংকটের পেছনে মূলত দুটি কারণ সামনে এসেছে। প্রথমত, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বল সমন্বয় এবং চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দের ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, অসাধু ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। এই দুইয়ের সমন্বয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে, যেখানে সরবরাহ চেইন তুলনামূলকভাবে দুর্বল, সেখানে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক সমন্বয় আনা প্রয়োজন। কোন অঞ্চলে কত চাহিদা, কোথায় কত সরবরাহ যাচ্ছে — এই তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ চেইনে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব।
মজুতদারি ও কালোবাজারি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বাজারে যদি প্রমাণিত হয় যে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।
জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, প্রয়োজনে অতিরিক্ত জাহাজ আনা এবং মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিদ্যমান মজুত কতদিন চলবে — এ তথ্য জনসাধারণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা উচিত, যাতে গুজব না ছড়ায়।
চাহিদা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমাতে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেশনিং পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে, যাতে সবাই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায়। পর্যটন ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। কারণ এসব খাত সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।
সবশেষে, সরকারের উচিত সংকটকে শুধুমাত্র একটি তাৎক্ষণিক সমস্যা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কঠোর পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে।
কেকে/এলএ