দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে হামসহ নানা সংক্রামক রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালে দেশে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। যার ফলে দেশে হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েই চলছে। শুধু মার্চ মাসে সারা দেশে হামে ৫৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ বা কেন হাম ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে হামের টিকার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা অনেক। মৃত্যু ও সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে হাম মহামারিতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। এই রোগ প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু যখন সেই হার অনেক এলাকায় ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে, তখন বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।
ক্রমাগত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের উপসর্গে শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর সেই আশঙ্কারই বাস্তব রূপ। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। গত কাল বৃহস্পতিবার হামে তিন জেলায় তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, অপারেশনাল পরিকল্পনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অনেক পদ শূন্য থাকা এবং টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা এসব মিলিয়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ধাক্কা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি এবং সেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে গভীর করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশে সর্বশেষ বড় আকারের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন হয়েছে-২০২০ সালে। এরপর আর কোনো জাতীয় পর্যায়ের ক্যাম্পেইন না হওয়ায় টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা ধীরে ধীরে জমা হয়েছে। এই ‘মিসিং’ শিশুদের বড় একটি অংশ কয়েক বছর পর বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা যে আশঙ্কা করছিলেন সেটি কিন্তু বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
হাম মহামারিতে রূপ নিতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আবার শক্তিশালী করতে হবে এবং মাঠ পর্যায়ে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে তাদের শনাক্ত করে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা জরুরি।
তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা, আইসোলেশন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এখনি কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ এর থেকেও ভয়ানক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই টিকাদান কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
কেকে/ এমএস