মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান হেল্থ’ প্রাসঙ্গিকতা ও চ্যালেঞ্জ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য- ‘টুগেদার ফর হেল্থ, স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স’ যার বাংলা করা হয়েছে ‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 

এই প্রতিপাদ্যটি বিজ্ঞাননির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের আহ্বান, এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য, এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ-এসব ক্ষেত্রে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব, এবং পরিবেশ দূষণ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে ‘ওয়ান হেল্থ’ ধারণাটি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত এই পদ্ধতি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করে। 

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ধারণার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি, কারণ এখানে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর সহাবস্থান খুবই ঘনিষ্ঠ। গ্রামীণ অঞ্চলে গবাদিপশু, পোল্ট্রি এবং মানুষের জীবনযাপন প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ফলে জুনোটিক রোগ-যেমন বার্ড ফ্লু, নিপাহ ভাইরাস ইত্যাদি সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

বাংলাদেশে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, এবং পশুপালনে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ-এসব কারণে এই সমস্যা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে উঠছে। ‘ওয়ান হেল্থ’ পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর চিকিৎসা এবং খাদ্য ব্যবস্থায় সমন্বিত নজরদারি গড়ে তোলা হলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। 

এছাড়া পরিবেশ দূষণ-বিশেষ করে বায়ু ও পানি দূষণ-বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত স্বাস্থ্যকে ‘ওয়ান হেল্থ’ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশে ‘ওয়ান হেল্থ’ বাস্তবায়নের একটি বড় সম্ভাবনা হলো দেশের শক্তিশালী কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিও নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। এই বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ খাতকে সমন্বিত করা গেলে একটি কার্যকর ‘ওয়ান হেল্থ’ মডেল গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে গবাদিপশু ও পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক এই মডেল বাস্তবায়নের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ভিত্তি তৈরি করবে।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশকিছু কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ-এই তিনটি খাত সাধারণত পৃথক নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ ‘ওয়ান হেল্থ’ পদ্ধতির মূল শক্তিই হলো এই সমন্বয়। পর্যাপ্ত গবেষণা ও ডেটা ঘাটতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে জুনোটিক রোগ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সংক্রান্ত সমন্বিত ডেটা এখনো সীমিত। ফলে ঝুঁকি নিরূপণ ও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। জনসচেতনতার অভাব ‘ওয়ান হেল্থ’ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। সাধারণ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে দেখে। প্রাণীর স্বাস্থ্য বা পরিবেশের সঙ্গে এর সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ‘ওয়ান হেল্থ’ বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলেছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রোগের প্রকৃতি ও বিস্তৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য ভেক্টর-বাহিত রোগ শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে, বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংস্পর্শ বাড়ার ফলে নতুন জুনোটিক রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ‘ওয়ান হেল্থ’ কৌশল গ্রহণের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে ‘ওয়ান হেল্থ’ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে।

এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য শক্তিশালী নীতিমালা ও আন্তঃখাত সমন্বয় নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি স্থায়ী সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। এটি হতে পারে একটি জাতীয় ‘ওয়ান হেল্থ’ কাউন্সিল, যেখানে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা যায়। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ‘ওয়ান হেল্থ’ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
 
ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্ম, রোগ পর্যবেক্ষণ সিস্টেম এবং ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ সম্ভব। গবেষণা ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ওয়ান হেল্থ’ বিষয়ক অন্তঃবিভাগীয় ও আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। চিকিৎসক, ভেটেরিনারিয়ান এবং পরিবেশবিদদের একসঙ্গে কাজ করার মতো একটি একাডেমিক ও পেশাগত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এতে করে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। 

জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ‘ওয়ান হেল্থ’ সফল হতে পারবে না। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য, প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়াও, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে ‘ওয়ান হেল্থ’ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়ন করতে হবে।

সবশেষে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ একা নয়; বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী রোগ বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close