মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ভুগছে বিশ্ব
মো. ফরহাদ হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

এক আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ভুগছে বিশ্ব। আমেরিকার জনগণ এক উন্মাদ যুদ্ধপাগলকে বসিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার পরিণতিও তারা ভোগ করছে। ট্রাম্প ধরে নিয়েছিলেন যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানে তাৎক্ষণিক শাসন পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে তিনি আয়াতুল্লাহ এবং ইরানি রেভোল্যুশনারি গার্ডদের ভয় দেখিয়ে বশ করতে পারবেন তার ভাবনা ছিল ভেনেজুয়েলার মতো আমেরিকার ইচ্ছা পালনের জন্য সেখানে একটি পুতুল সরকার বসিয়ে দেবেন।

কিন্তু তার এই পরিকল্পনা যে কতটা কাল্পনিক ছিল তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। এ বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তগুলো একটি গভীর ব্যাধির লক্ষণ। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার এ চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বিশ্বকে মন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে ফেলছে এক গভীর সংকটে। আর এই যুদ্ধের জন্য কি শুধু ট্রাম্প দায়ী? একজন ব্যক্তি একা একটি পুরো দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে না যদি না সেই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই ভেঙে পড়ে। আমেরিকার ইরান যুদ্ধে জড়ানো এটিই প্রমান করে যে দেশটির অভ্যন্তরে গভীর গণতান্ত্রিক সংকট রয়েছে। 

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যখন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর অধীনে আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর নজিরবিহীন বিমান হামলা শুরু করে, তখন বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অত্যন্ত জটিল এবং পরস্পর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক প্রলয়ঙ্কারী আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

যুদ্ধের প্রথম ১২ ঘণ্টায় ইরানের নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল অবকাঠামো লক্ষ করে প্রায় ৯০০টি হামলা চালানো হয়, যার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা নিহত হন। এ সামরিক অভিযানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক সংকটের সূত্রপাত হয়, যা ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটকেও হার মানিয়েছে যুদ্ধের সূচনালগ্নেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। 

যুদ্ধের আগে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৬-৭০ ডলারের মধ্যে থাকলেও, সংঘাতের মাত্র দশ দিনের মাথায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায় । রয়টার্সের এক জরিপ অনুযায়ী, ৩৮ জন অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক ২০২৬ সালের জন্য তেলের মূল্যের পূর্বাভাস ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২.৮৫ ডলার করার কথা বলেছেন, যা ২০০৫ সালের পর একক কোনো জরিপে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি। বিশ্লেষকদের ধারণা যদি হরমুজ প্রণালির অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন, এ মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সরাসরি শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি খরচের এই উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে একটি ‘সাপ্লাই-সাইড শক’ বা সরবরাহ জনিত আঘাত হিসেবে কাজ করছে, যা উৎপাদনকারীদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হরণ করছে।

যদিও সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত লোহিত সাগর এবং ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে সীমিত আকারে তেল সরবরাহের বিকল্প পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে, তবে এ অবকাঠামো ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় এগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, কাতারের রাস লাফান এলএনজি কমপ্লেক্সে হামলার ফলে দেশটির উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

জ্বালানি মূল্যের এ অভাবনীয় বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা স্থবির মুদ্রাস্ফীতির এক প্রবল ঝুঁকি তৈরি করেছে। যখন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, তখন তাকে স্ট্যাগফ্লেশন বলা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে ঠিক সেই দিকেই ধাবিত করছে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বর্তমানে এক জটিল সংকটের সম্মুখীন। সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বৃদ্ধি করা হয়, কিন্তু বর্তমানের এ মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং সরবরাহের ঘাটতির কারণে তৈরি হয়েছে। ফলে সুদের হার বৃদ্ধি করলে তা অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইসিবি ইতোমধ্যেই তাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এবং ফেডারেল রিজার্ভও সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো, যারা তাদের আয়ের প্রায় ৮৮ শতাংশ খাদ্য, আবাসন এবং পরিষেবার পেছনে ব্যয় করে, তারা এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউটিলিটি বা বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম এক বছরে ৬.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ অঙ্কের হারে বাড়ছে।

ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে টোকিও বা লন্ডন সবখানেই পুঁজিবাজার এই যুদ্ধের প্রভাবে কাঁপছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ ইনডেক্স ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ১৩.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে খারাপ পতন। ডলারের মান নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বৃদ্ধি পেলেও, উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলো তাদের মান হারাচ্ছে। যুদ্ধের ধোঁয়াশা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট যুদ্ধকালীন বক্তব্যের কারণে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন এবং সোনা বা অন্যান্য ‘সেফ হ্যাভেন’ সম্পদে আশ্রয় নিচ্ছেন।

২০২৬ সালের এই যুদ্ধ শুধু তেলের পাইপলাইনকে ব্যাহত করেনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সরবরাহ শৃঙ্খলকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য শুধু তেল নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের অন্যতম প্রধান উৎস।

বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত ইউরিয়া ও নাইট্রোজেন ঘটিত সারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সার উৎপাদন কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উত্তর গোলার্ধে যখন চাষাবাদের মৌসুম শুরু হচ্ছে, তখন সারের অভাব এবং উচ্চমূল্য কৃষকদের দিশেহারা করে ফেলছে। দ্য ফুড পলিসি ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে যে, সারের দাম বাড়লে তা সরাসরি খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমিয়ে দেবে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

কাতারের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ হওয়ার একটি পরোক্ষ কিন্তু মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে। কাতার বিশ্বের হিলিয়াম গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে, যা সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ তৈরির জন্য অপরিহার্য। এ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে গাড়ি থেকে শুরু করে স্মার্টফোন উৎপাদন পর্যন্ত থমকে যেতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপের বড় বড় রাসায়নিক শিল্প, যেমন জার্মানির বিএএসএফ, কাঁচামালের সংকটে পড়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সংগঠন জিসিসি গত কয়েক দশক ধরে নিজেদের বিশ্বের স্থিতিশীল অর্থনৈতিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। দুবাই বা দোহার মতো শহরগুলো পর্যটন, ব্যবসা এবং বিমান চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধ এই ‘নিরাপদ মধ্যপ্রাচ্যের’ ধারণাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

জিসিসি দেশগুলোর জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ আসে পর্যটন এবং ভ্রমণ খাত থেকে। যুদ্ধের কারণে আকাশপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় বড় এয়ারলাইনসগুলো শত শত ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে এখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। পর্যটকরা এখন আর উপসাগরীয় অঞ্চলকে নিরাপদ গন্তব্য মনে করছেন না, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি আঘাত।

জিসিসি দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় ক্যালরির ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে, যার বেশির ভাগই আসে সমুদ্রপথে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এ দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বড় বড় রিটেইল চেইন যেমন লুলু রিটেইল এখন উড়োজাহাজে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনার চেষ্টা করছে, যার ফলে বাজারে পণ্যের দাম ৪০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সৌদি আরব এবং কুয়েতের মতো ধনী দেশগুলোও এখন তাদের নাগরিকদের রেশনিংয়ের কথা চিন্তা করছে।

তবে সবথেকে বাজে প্রভাব পরেছে মিশর, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতের মতো উদীয়মান দেশগুলোতে। উদীয়মান অর্থনীতির এ দেশগুলো এক ভয়াবহ ‘ট্রিপল স্কুইজ’ বা ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়েছে। এ চাপগুলো হলো জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ঋণের উচ্চ সুদের হার। মিশরের পাউন্ড ডলারের বিপরীতে ৮ শতাংশেরও বেশি মান হারিয়েছে। মিশরকে আগামী এক বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের ইউরোবন্ড পরিশোধ করতে হবে, যা বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানকেও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। জ্বালানির দাম বাড়লে এ দেশগুলোর বাণিজ্য ঘাটতি আকাশচুম্বী হবে, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ দেউলিয়া অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। 

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর। মিশরের রেমিট্যান্সের ৭৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৬২ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের কারণে জিসিসি দেশগুলোর অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। এর ফলে এ দেশগুলোতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সরাসরি কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলবে।

আমেরিকা এই যুদ্ধের মূল হোতা হলেও তার নিজস্ব অর্থনীতিও এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন বড় একটি তেল উৎপাদনকারী দেশ, তবুও বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আমেরিকান ভোক্তাদেরও উচ্চমূল্যের গ্যাসলিন কিনতে হচ্ছে। অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ইতোমধ্যেই ১৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে এবং পেন্টাগন আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে। আমেরিকার ফেডারেল ঋণ ইতোমধ্যেই ৩৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের এ অতিরিক্ত খরচ মেটাতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্যের বাজেট কাটছাঁট করতে হতে পারে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঘরোয়া রাজনীতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে মেরুকরণ করছে। ইরানকে দমনে আমেরিকার এই আগ্রাসন চীন এবং রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে। চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার বিশাল বিনিয়োগ থাকায় দেশটি এখন বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গড়ার দিকে মন দিচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক দেশ এখন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করার চেষ্টা করছে, যাতে ভূ-রাজনৈতিক সংকটে তাদের অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকে।

যুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতি সম্ভবত আর আগের জায়গায় ফিরে যাবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, হাজার হাজার মাইল দূরের সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে ‘নিয়ার-শোরিং’ বা ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’-এর প্রবণতা বাড়বে, যেখানে কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি বা রাজনৈতিকভাবে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোতে সরিয়ে নেবে। এটি উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দিলেও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে। 

লেখক : কবি ও গণমাধ্যমকর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close