সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : উত্তরণের উপায়
অধ্যাপক এম শামসুল আলম
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:০৯ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আজ একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। গত তিন দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও, এই খাতের ভেতরে জমে উঠেছে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং শাসনব্যবস্থার ঘাটতি। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করা যায়নি। এই বাস্তবতা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো। এলএনজি, কয়লা, তেল ও বিদ্যুৎ আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগ, বিশেষ করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা উপেক্ষিত হয়েছে, যা ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহিতার সংকটও তৈরি করেছে।

২০১০ সালের বিশেষ আইন দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও, তা টেকসই ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এই আইনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফল আজও বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বারবার বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বিশেষ করে বিইআরসি-র সীমিত কার্যকারিতা, এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

এই সংকটকে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির সংকট, যেখানে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বয়ে একটি বাণিজ্যিকীকরণমুখী জ্বালানি কাঠামো গড়ে উঠেছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি একটি মৌলিক জনসেবা, যা নাগরিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ন্যায়বিচারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির ব্যয় ও সুবিধার ন্যায্য বণ্টন, নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা- এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে জ্বালানি ন্যায়বিচারের ধারণা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় এই তিন ক্ষেত্রেই দুর্বলতা স্পষ্ট।

সমাধানের পথ তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তা এই পরিবর্তনের একটি বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই দাবিগুলোর মূল বক্তব্য হলো- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক নয়, বরং জনসেবা খাত হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে মুনাফাভিত্তিক চাপ কমিয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি কমিয়ে স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি করা, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো, এবং এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা সীমিত করা- এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং অব্যবহৃত গ্যাস সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি পুনর্বিবেচনা, বিশেষ আইন বাতিল করে স্বচ্ছ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা এবং জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য পুনঃনির্ধারণ করা এবং বিইআরসি'কে একটি স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি চুক্তির ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে এই পরিবর্তন কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার- আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সক্ষম করে তোলা, নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সুশাসন ও ন্যায়বিচারের পরীক্ষাও।

এই সংকটকে যদি সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়, তবে এটি একটি সুযোগেও পরিণত হতে পারে। নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধ, এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলোর পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

সবশেষে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার আজ আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। এটি এখন জাতীয় অগ্রাধিকার। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাই পারে দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে। “সবার আগে বাংলাদেশ” - এই নীতিকে সামনে রেখে এগোতে পারলেই এই সংকট থেকে উত্তরণের বাস্তব পথ তৈরি হবে।

লেখক : জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ডিআইইউ।

কেকে/এজে



আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি সংকট   উত্তরণের উপায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close