বাংলাদেশের ক্রিকেট আবারও প্রমাণ করল মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরের লড়াইটাই যেন এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডকে ঘিরে যে রাজনৈতিক দুষ্টচক্র, তার থেকে মুক্তি মেলে না কখনোই। সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সরকার যায়, সরকার আসে। ‘নির্বাচিত সরকার’, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আবার নির্বাচিত সরকার। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে অ্যাডহক কমিটি গঠন নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাবের গভীরতা ও বিস্তারকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। অভিযোগ আছে নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে, তদন্ত কমিটি তা খুঁজে পেয়েছে এসব যুক্তি সামনে আনা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এ প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ এবং কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? আরও উদ্বেগজনক হলো, নতুন গঠিত কমিটির গঠনপ্রণালি।
রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সংযোগ এবং ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ যেভাবে উঠে এসেছে, তা দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে। এডহক কমিটির প্রধান করা হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে, যিনি বিসিবির ৬ অক্টোবরের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও পরে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
অ্যাডহক কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে আছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের স্ত্রী আইনজীবী রাশনা ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের ছেলে ইসরাফিল খসরু।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখানে বারবার দেখা যায় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডের নেতৃত্বও পাল্টে যায়। ফলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ক্রিকেট।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নীতিমালা স্পষ্ট সদস্য দেশের ক্রিকেট বোর্ডে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে এমন হস্তক্ষেপের কারণে বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো, ক্রিকেটারদের অর্জন ও মাঠের সাফল্য বারবার প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। যে খেলাটি কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্র, সেটিই এখন ক্ষমতার লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো রাজনীতির প্রভাবমুক্ত একটি স্বশাসিত ও পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো। নইলে বোর্ডের চেয়ার দখলের এই অন্তহীন খেলা চলতেই থাকবে, আর মাঠের ক্রিকেট থেকে যাবে উপেক্ষিত।
সময়ের দাবি স্পষ্ট ক্রিকেটকে রাজনীতির হাত থেকে মুক্ত করা। না হলে, বাংলাদেশের ক্রিকেট যতই প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করুক না কেন, তার সম্ভাবনা বারবার প্রশাসনিক অস্থিরতার কাছে পরাজিত হবে।
কেকে/ এমএস