উচ্চশিক্ষা কোনো দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। আর এ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে গবেষণা যেখানে সৃষ্টি হয় নতুন জ্ঞান, উদ্ভাবন ও সমাধান। সেই জায়গায়ই যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়; বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পটি ছিল দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের একটি বড় সুযোগ। প্রায় চার হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গবেষণাকে গতিশীল করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা।
কিন্তু শুরু থেকেই প্রকল্পটি ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা উদ্বেগজনকই নয়, বরং গভীরভাবে হতাশাজনক। অভিযোগ রয়েছে যোগ্য ও স্বীকৃত গবেষকদের উপেক্ষা করে কম অভিজ্ঞতা ও কম সাইটেশনধারী ব্যক্তিদের প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার তোয়াক্কা না করে অসংগতভাবে রিভিউয়ার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রকল্প বণ্টনের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু অনৈতিক নয়, বরং জাতীয় স্বার্থবিরোধী। আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে গবেষণা অনুদানের একটি বড় অংশ ভাগবাঁটোয়ারার মাধ্যমে বণ্টনের চেষ্টা চলছে। যদি সত্যিই রিভিউ প্রক্রিয়া প্রভাবিত করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা দুর্নীতির চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
বিশ্বব্যাংকের অসন্তোষ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন ‘সন্তোষজনক’ বলা হচ্ছে, অন্যদিকে অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে এই দ্বৈততা দূর করা জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া এ ধরনের বড় প্রকল্প সফল হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো সমাধান কোথায়?
প্রথমত, গবেষণা প্রকল্প বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্বাধীন ও দক্ষ রিভিউ বোর্ড গঠন জরুরি।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারি ও অডিট নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি বৈষম্য দূর করে তাদেরও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণাকে কোনোভাবেই ‘লাভজনক বাণিজ্য’ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রক্রিয়া। এখানে অনিয়মের সুযোগ রাখা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দেওয়া। হিট প্রকল্প এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই সংশোধনের সুযোগও এখনো আছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি আন্তরিকভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এ প্রকল্প এখনো দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। অন্যথায় এটি হয়ে উঠবে অপচয়, অনিয়ম ও অপূর্ণ সম্ভাবনার আরেকটি দৃষ্টান্ত। মোদ্দা কথা গবেষণার অর্থ যেন গবেষণাতেই ব্যয় হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
কেকে/ এমএস