মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে যে নতুন সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আর কেবল ভূরাজনীতি বা কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন মানবিক নিরাপত্তার এক গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ওই অঞ্চলে কর্মরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবনে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা প্রতিদিনই বাড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি তাঁদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। কিন্তু যুদ্ধের ছায়া যখন সেই অঞ্চলকে গ্রাস করে, তখন এই প্রবাসীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি—ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান—সংঘাতকে এমন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হামলা পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। এই সংঘাতের বিস্তৃতি এখন একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেরি না করে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে সতর্কতা এবং জরুরি সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনে প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় যারা দেশে বা বিদেশে আটকে পড়েছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য।
এছাড়া, এই সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক আয়ের ওপর চাপ—এসব বিষয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট খাতে আগাম প্রস্তুতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নন—তাঁরা আমাদের দেশের গর্ব, আমাদের পরিবারের সদস্য। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক, মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির সময়ে তাই একটাই প্রত্যাশা—সরকার যেন দ্রুত, কার্যকর এবং মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়ায়। কারণ তাঁদের নিরাপত্তাই আজ জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হওয়া উচিত।
লেখক: লেকচারার এসেক্স বিজনেস স্কুল, সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ইউকে
কেকে/ এমএস