মাত্র ছয় সপ্তাহের ইরান যুদ্ধে ওলটপালট হয়ে গেছে গোটা দুনিয়ার অর্থনীতি। পাল্টে গেছে গত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বিশ্ববাণিজ্যের চেনা সমীকরণ। ‘মুক্ত সমুদ্রে অবাধ বিচরণ’, এই নীতির ওপর ভিত্তি করে সমৃদ্ধ হয়েছে বিশ্বের বহু জাতি ও মানুষ। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ধমনি হরমুজ প্রণালিকে এক ‘বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার’ প্রতীকে পরিণত করেছে।
ইরান যুদ্ধ তথা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংকট কাটাতে ১৫ দিনের যুদ্ধ বিরতির কথা থাকলেও সেটি ভঙ্গ করে লেবাননে আক্রমণ চালিয়েছিল ইসরায়েল। ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় করা সেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি এরপর আবারো পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত শনিবার ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা চলে। তবে সেই আলোচনা কোনো ফল বয়ে আনেনি। কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা ভেঙে যায়, যা বর্তমান বিশ্বের জন্য এক অশনিসংকেত।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের কারণে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হয়, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে ৩য় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়ার। সবথেকে উদ্বেগজনক ব্যাপারটি হলো, প্রায় ২০ হাজার নাবিক এখন সমুদ্রে কার্যত জিম্মি।
তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোন জাহাজ এই ৩০ মাইল প্রশস্ত জলপথ দিয়ে পার হবে আর কাকে কত মাসুল দিতে হবে, তা ঠিক করবে তারাই। মার্কিন নৌবাহিনীর চোখের সামনেই কার্যকর হচ্ছে এই ‘তেহরান টোল বুথ’। বৈশ্বিক পরাশক্তির হিসাব-নিকাষের বাঁকবদলে বিপদে পড়তে যাচ্ছে ৩য় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো। বিশ্ব জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে আসে, সেখানে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ‘টোল’ আদায় বিশ্ববাজারে তেলের দামকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
এর পাশাপাশি ইরান কর্তৃক চীনা ইউয়ান বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে টোল আদায়ের বাধ্যবাধকতা সরাসরি মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটি বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থাকে যে ধাক্কা দিবে সেটি সামলাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু?
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে কেবল ঘটনা পর্যবেক্ষণ না করে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আমাদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হওয়া উচিত জ্বালানি নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বা হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। সরকারকে এখনই জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত আপৎকালীন মজুত নিশ্চিত করতে হবে এবং বিকল্প আমদানির উৎসগুলো সচল রাখতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্স প্রবাহ রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখনই একটি বিশেষ ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ তৈরি করতে হবে। যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই চূড়ান্ত রাখা জরুরি। বৈশ্বিক এই অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা সরাসরি আমাদের খাদ্য ও শিল্প পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। সরকারকে আমদানিনির্ভর পণ্যের মজুত বাড়াতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার সিন্ডিকেট রুখতে কঠোর হতে হবে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে হবে। কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে হবে।
আমরা মনে করি, বৈশ্বিক এ সংকটকে হালকাভাবে দেখার আর সুযোগ নেই; আগাম সতর্কতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনাই পারে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।
কেকে/ এমএস