ভোরের আলো ফোটার আগেই যে কৃষক লাঙল কাঁধে মাঠে নামেন, তিনিই এ দেশের প্রকৃত মেরুদণ্ড। অথচ দশকের পর দশক ধরে এই পরিশ্রমী মানুষগুলো সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরেই থেকে গেছেন। সারা দিন রোদে পুড়ে ফসল ফলালেও তাদের হাতে সময়মতো ভর্তুকির টাকা পৌঁছায়নি কিংবা সহজ ঋণের সুযোগ মেলেনি। বীজ কিনতে গিয়েও তাদের বারবার প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে।
কৃষকদের এ দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটাতেই সরকার এবার সরাসরি মাঠে নামছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আসছে বিশেষ এক কৃষক কার্ড। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং বঞ্চনার আঁধার কেটে নতুন ভোরের সূচনা হবে।
আগামী ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের দিনে এ কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। এর চেয়ে প্রতীকী দিন আর কী হতে পারে? নতুন বছরের প্রথম দিনে কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হবে তার পরিচয়ের স্বীকৃতি। আগামী চার বছরে দেশের এক কোটি পঁয়ষট্টি লাখ কৃষক পরিবারের কাছে এ স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু ধান-পাট চাষির কথা ভাবা হয়নি, মৎস্যচাষি এবং দুগ্ধ খামারিরাও এ কার্ডের আওতায় আসবেন। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয়শ একাশি কোটি টাকা।
এ কার্ড আসলে কী দেবে কৃষককে? প্রশ্নটা স্বাভাবিক, কারণ কাগজে-কলমে অনেক প্রতিশ্রুতি আগেও দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, একটি কার্ডের মাধ্যমেই কৃষক পাবেন দশটি বিশেষ সুবিধা। ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পাওয়া যাবে। সরকারি ভর্তুকি সরাসরি পৌঁছাবে কৃষকের নিজের ব্যাংক হিসাবে। সেচের খরচ কমবে, সহজ শর্তে মিলবে কৃষিঋণ, থাকবে শস্যবিমার সুবিধাও। এর বাইরে ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রির সুযোগ, আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার আগাম তথ্য এবং রোগবালাই দমনে বিশেষজ্ঞ পরামর্শও মিলবে এ একটি কার্ডের আওতায়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, প্রতিটি কার্ডধারী কৃষকের জন্য সোনালী ব্যাংকে আলাদা হিসাব খোলা হবে। সরকারি ভর্তুকির অর্থ সরাসরি সেই হিসাবে জমা হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত ঘুরে আসার পুরোনো সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রত্যেক কার্ডে কৃষকের পঁয়তাল্লিশ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, যা ডিজিটাল ডেটাবেজে যুক্ত হবে।
কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি বেশ চিন্তাশীল পদক্ষেপ। পাঁচ শতাংশের কম জমির মালিক হলে ভূমিহীন, পাঁচ থেকে উনপঞ্চাশ শতাংশ হলে প্রান্তিক, পঞ্চাশ থেকে দুইশ উনপঞ্চাশ শতাংশ হলে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এর বাইরে থাকবেন মাঝারি ও সচ্ছল কৃষক। ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা গড়ে আড়াই হাজার টাকা করে ভর্তুকি বা কৃষি উপকরণ সহায়তা পাবেন।
পাইলট পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের নয়টি উপজেলার নয়টি ব্লকে কার্ড বিতরণ শুরু হবে। উপজেলাগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, যা ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়ার একটি ইতিবাচক দিক। প্রাক-পাইলট পর্যায়ে আগামী পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে সব শ্রেণির কৃষকের তথ্য সংগ্রহ শেষ হবে।
তবে এতটুকু পড়ে যদি কেউ ভাবেন, এটি নিখুঁত একটি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই, তাহলে কিছুটা থামা দরকার। একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, উদ্যোগটি যত প্রশংসনীয়, চ্যালেঞ্জগুলো তত কম নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা কতটা নিখুঁতভাবে হবে? দেশে অনেক জায়গায় কৃষকের হালনাগাদ তালিকা নেই, তদারকির অভাবে অ-কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ন্যায্যমূল্যে সার বা অন্যান্য উপকরণ বিতরণের সময় স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা বিরল নয়। শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেই চলবে না, মাঠ পর্যায়ে সৎ তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, ডেটাবেজ কতটা নির্ভরযোগ্য হবে? পঁয়তাল্লিশ ধরনের তথ্য সংগ্রহ মানে বিশাল এক তথ্য-সম্ভার পরিচালনা করা। এই ডেটা নিয়মিত আপডেট করা না হলে এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে পুরো ব্যবস্থাটি সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয় প্রশ্নটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : এ কার্ড কি সত্যিই কৃষকের জীবনমান বদলাবে? উত্তর হলো, কার্ড একা কিছু করে না। কার্ড হলো একটি মাধ্যম। এ মাধ্যমের পেছনে যদি স্বচ্ছ নীতি, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সুদৃঢ় ভিত না থাকে, তাহলে সেরা পরিকল্পনাও মাঠে মার খায়। তবে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা গেলে এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ সত্যিই মাইলফলক হতে পারে।
উল্লেখ করা দরকার, নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। মওকুফ করা মোট ঋণের পরিমাণ এক হাজার পাঁচশত পঞ্চাশ কোটি টাকা, এতে উপকৃত হচ্ছেন কমপক্ষে বারো লাখ কৃষক। কৃষক কার্ড প্রকল্প তাই বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, এটি কৃষি খাতে একটি বৃহত্তর সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
একটু পিছিয়ে যদি ভাবি, এ কৃষক কার্ডের মূল দর্শনটি কী? এটি শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়, এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃষকের প্রতি একটি স্বীকৃতি। বলা হচ্ছে যে, তুমি এই দেশের খাদ্যভান্ডার ভরাও, তোমাকে সরকার চেনে, তোমার অধিকার আছে রাষ্ট্রের সুবিধা পাওয়ার। এ মনস্তাত্ত্বিক স্বীকৃতির গুরুত্বকে ছোট করে দেখার উপায় নেই।
সবমিলিয়ে বলতে চাই, সদিচ্ছা আছে, কাঠামো আছে, অর্থও বরাদ্দ হয়েছে। এখন দরকার মাঠ পর্যায়ের কঠোর তদারকি, দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহিষ্ণুতা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার। যদি এ তিনটি শর্ত পূরণ করা যায়, তাহলে কৃষকের হাতে শুধু একটি কার্ড নয়, তার স্বপ্নের চাবিকাঠিও তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। আর সেই স্বপ্ন পূরণ হলে লাভ শুধু কৃষকের নয়, লাভ পুরো দেশের।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
কেকে/ এমএস