আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। কবির ভাষায়—‘নতুন ঊষা, নতুন আলো/নতুন বছর কাটুক ভালো/কাটুক বিষাদ, আসুক হর্ষ/শুভ হোক নববর্ষ’।
বাংলা বর্ষ ১৪৩২ বিদায় নিয়েছে, আজ থেকে শুরু হলো ১৪৩৩। পুরোনো বছরের ক্লান্তি, হতাশা আর অপ্রাপ্তিকে পেছনে ফেলে নতুন আশায় বুক বাঁধার দিন এটি। সুরে-বাণীতে, সাজসজ্জায়, আহারে-বিহারে, আনন্দ-উল্লাসে আজ মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ।
বৈশাখ বাংলার সার্বজনীন পাটাতন। এই পাটাতন আমাদের সকলের একসঙ্গে দাঁড়ানোর জায়গা। এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামষ্টিক পরিচয়ের অনন্য প্রতীক। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তথ্যপ্রযুক্তির এই আধুনিক সময়েও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষক তার ফসল উৎপাদনের সময় নির্ধারণ করেন।
বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়ে নতুন করে উজ্জীবিত হয়। বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও হালখাতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির বহুমাত্রিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরে এবং জাতীয় ঐক্যবোধকে আরও শক্তিশালী করে।
বাংলা নববর্ষ নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। প্রকৃতির নবজাগরণ ও মানুষের অন্তরের আশাবাদ মিলেমিশে সৃষ্টি করে উৎসবমুখর পরিবেশ। এই আনন্দময় পরিবেশের মধ্যেই নববর্ষ আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—সময়ের বাস্তবতা। কারণ, উৎসবের উচ্ছ্বাসের মাঝেও সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সংকট আমাদের ঘিরে আছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব—জ্বালানি সংকট—এসবই সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। অনেক মানুষের জন্য জীবনযাপন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
তাই নববর্ষ শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারেরও সময়। একটি বছর পেরিয়ে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারও সুযোগ এনে দেয় এই দিনটি। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করা আজ সময়ের দাবি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন বিভাজন বা সহিংসতার কারণ না হয়।
বাংলা নববর্ষের মূল শক্তি এখানেই—এটি মানুষকে একত্র করে। ধর্ম, মত, শ্রেণি বা পেশা নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবের অংশীদার হয়। বৈশাখ আমাদের শেখায়, ভিন্নতার মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব। সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই পারে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।
নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা, রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য। উন্নয়ন হবে সবার জন্য সমানভাবে। আসুন, নববর্ষের পহেলা দিনে আমরা শপথ নিই একটি মানবিক ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার।
কেকে/এলএ