মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
এবার লবণ নিয়ে কারসাজি
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:১৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট এখনো কাটেনি। অনেক দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই, কিছু কোম্পানির পণ্য তো পুরোপুরি গায়েব। এবার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে লবণ। বর্তমানে লবণ নিয়ে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বা সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ভোজ্যতেলের পাশাপাশি লবণেরও সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারে লবণের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে এবং কোথাও কোথাও লবণ পাওয়া যাচ্ছে না—এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে।

চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজারের প্রায় ৬৮,৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হলেও কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টির আশঙ্কায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদনকারী চাষিরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এবং কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে তাদের উৎপাদিত লবণ মাঠেই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে লবণের সরবরাহ কমে যাওয়া ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর আগেভাগে কিনে রাখার কারণে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে।

এ ছাড়া উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম মিলছে কম। এর ওপর হঠাৎ বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে লবণ মাঠের। এমন অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন লবণচাষিরা। অনেক চাষি মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে লবণ উৎপাদনও কমে গেছে। এদিকে পশুর চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণ। তাই কোরবানির ঈদ সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীরা লবণ আগেই মজুত করা শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে বাজারে ভোজ্যতেলের মতো লবণেরও সংকট দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবারই কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে একটি অসাধু চক্র কোরবানির আগে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তাদের কারসাজির কবলে পড়েছে লবণ। পাইকার ও আড়ৎদারদের দাবি, সরকারের নজরদারির অভাবে লবণের সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুত আছে। সিন্ডিকেট করে যারা দাম বাড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করা হচ্ছে।

বাজারে লবণের সরবরাহ কম

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সরবরাহ নামমাত্র বাড়লেও সংকট কাটেনি ভোজ্যতেলে। বরং ভোক্তার হয়রানি বেড়েছে। সয়াবিন তেলের এই অরাজকতার মধ্যেই সরবরাহ সংকটে পড়েছে লবণ।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে লবণের সরবরাহ কমে গেছে। দোকানিরা বলছেন, গত কিছুদিন ধরে তারা সরবরাহ কম পাচ্ছেন। সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকটে সরবরাহ কম বলে তাদের ধারণা। এভাবে লবণের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, সেগুনবাগিচাসহ বেশিরভাগ বাজারের দোকানেই এই অবস্থা। বাড্ডার বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, পাঁচ থেকে ছয়টি দোকান ঘুরেও সয়াবিন কিনতে না পেরে সরিষার তেল কিনেছেন। দোকানিরা বলছেন, সামনে কোরবানির ঈদ। তাই লবণেরও সরবরাহ কমেছে।

বাড্ডার এক মুদি দোকানি নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘দুই-তিন দিন আগে লবণ দিয়েছিল একটি কোম্পানি, যা এক বেলাতেই শেষ। এখন ক্রেতা এলেও তাদের দিতে পারছি না।’

এদিকে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণ। এর সঙ্গে জড়িত পোস্তার ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির আগে লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচ বাড়বে। তাই অনেকে আগেই লবণ মজুত করবে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুরান ঢাকার পোস্তার এক কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘সারা বছরে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়, তার ৫০ শতাংশই আসে কোরবানিতে। প্রতি বছর দেখা যায়, কোরবানি সামনে রেখে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।’

অন্যদিকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট মাঠপর্যায়ে লবণের দাম কমিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন কক্সবাজারের লবণচাষিরা। তারা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির চেষ্টা করছে, যা দেশীয় লবণ শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। পরিবহন ও ইজারা সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগও করেছেন তারা, যারা লবণের সরবরাহ ও রফতানি শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দাবি করছে যে, তারা বাজার নিবিড়ভাবে মনিটরিং করছে এবং মাঠপর্যায়ের চাষিদের সুরক্ষা দিতে মিল মালিকদের উৎসাহিত করছে।

লবণ উৎপাদনে ধস

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ টন, যা গত মৌসুমের তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন কম। গত মৌসুমে একই সময়ে লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন।

লক্ষ্যমাত্রার কম লবণ উৎপাদনের কারণ জানতে চাইলে বিসিকের কক্সবাজার লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ৭ ও ৮ এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে শতভাগ লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে (নষ্ট) গেছে। তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চাষিদের লবণ উৎপাদনে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন বিলম্ব হয়েছে। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এখন প্রচণ্ড রোদ দেখা দিলেও ঝড়বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় চাষিরা মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে মাঠ ও মিল (কারখানা) পর্যায়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার টন লবণ মজুত রয়েছে।

লবণচাষি ও কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, বৈরী পরিবেশ ও দুর্যোগের কবলে পড়ে লবণচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। লবণ আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। লবণ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবসার সঙ্গে জেলায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ জড়িত।

লবণ চাষসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের লবণ শিল্পকে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রান্তিক চাষিরা আরও সংকটে পড়বেন। তারা লবণ আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  লবণ   কারসাজি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close