সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
সমুদ্রপথে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৃত্যুফাঁদ মানবতার জন্য এক নির্মম সতর্কবার্তা
সৈয়দ আতিক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৩৫ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথ আবারও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা UNHCR-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গার প্রাণহানি ঘটেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি মানবতার চরম ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

সমুদ্রপথে পালিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা নতুন নয়, তবে ২০২৫ সালকে “সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর” হিসেবে চিহ্নিত করা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। সে বছর সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পাড়ি জমিয়েছেন, যেখানে প্রতি সাতজনের একজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ১৪ শতাংশ মৃত্যুহার—যা বিশ্বের যেকোনো প্রধান সমুদ্রপথের তুলনায় সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান শুধু বিপদের মাত্রাই নয়, বরং এক ভয়ংকর বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে—এই পথ প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর সমান।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। সবচেয়ে দুর্বল ও সুরক্ষাহীন মানুষরাই এখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। ২০২৬ সালেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮০০-র বেশি রোহিঙ্গা একই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। অর্থাৎ, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা আন্দামান সাগরে ডুবে যায়, যেখানে আনুমানিক ২৫০ জন নিখোঁজ হন। পরে ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। একটি ঘটনার এই নির্মম পরিণতি পুরো সংকটের চিত্রকে সামনে নিয়ে আসে—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক মানবিক বিপর্যয়ের অংশ।

এই মৃত্যু-যাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নির্যাতন, নাগরিকত্বহীনতা এবং নিরাপত্তাহীনতা রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি থেকে উৎখাত করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় পেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাব তাদের হতাশ করে তুলছে। ফলে তারা মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে জীবনবাজি রেখে সমুদ্রপথে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌকা—এই যাত্রাকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে।

এখানে একটি কঠিন সত্য স্পষ্ট—শুধু ত্রাণ বা অস্থায়ী সহায়তা দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি টেকসই, রাজনৈতিক ও মানবিক সমাধান। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। একইসঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সমুদ্রপথে নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করাও জরুরি।

রোহিঙ্গা সংকট আজ আর শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক মানবাধিকারের প্রশ্ন। ৯০০ প্রাণহানি, ৬,৫০০ ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, প্রতি সাতজনে একজনের মৃত্যু—এই পরিসংখ্যানগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রতিটি হারানো প্রাণ আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক।

এখনই সময়—এই মৃত্যু-যাত্রা থামাতে কার্যকর, সমন্বিত ও মানবিক পদক্ষেপ নেওয়ার। নতুবা, আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে, আর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সিটি নিউজ ঢাকা

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  সমুদ্রপথ   রোহিঙ্গা   শরণার্থী   মৃত্যুফাঁদ   সতর্কবার্তা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close