মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাংলার সুফি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা এবং লোকজ ঐতিহ্যের এক নিবিড় সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গ্রামীণ জনপদ এবং পুরান ঢাকার বকশীবাজারের নগরীয় সুফি সংস্কৃতির মধ্যে যে যোগসূত্র, তা বাংলার সামগ্রিক ঐতিহ্যের এক অনন্য ও বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক দশকে বিশ্বায়ন, নগরায়ণ এবং প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে এই সাংস্কৃতিক কাঠামোতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তা বর্তমান সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। 

নব্বইয়ের দশকের গ্রামীণ জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে আধুনিক ঢাকা মহানগরের সুফি খানকাহ ভিত্তিক ঐতিহ্যের বিবর্তন এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গ্রামীণ জনপদে আধ্যাত্মিকতার প্রাত্যহিক চর্চা: আনোয়ারা উপজেলার প্রেক্ষাপট

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিকভাবে সুফি-সাধকদের পদচারণায় ধন্য একটি অঞ্চল। নব্বইয়ের দশকে এই অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় আধ্যাত্মিকতা কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল একটি সমষ্টিগত সামাজিক আচার। মাগরিবের নামাজের পর প্রতিটি গৃহে বালকদের সমস্বরে আল্লাহর জিকির এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শানে দরুদ পাঠের যে প্রথা প্রচলিত ছিল, তা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শৃঙ্খলা ও রুহানি আবহ তৈরি করত। এই চর্চাটি কেবল ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল শিশুদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি প্রাথমিক ধাপ।

সান্ধ্যকালীন আচার ও শিক্ষা সংস্কৃতির সমন্বয়

গ্রামীণ জনপদে মাগরিব পরবর্তী সময়টি ছিল অত্যন্ত পবিত্র এবং সুশৃঙ্খল। প্রতিটি পরিবার, সে ধনী হোক বা দরিদ্র, তাদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিল। জিকির ও দরুদ পাঠের সেই গুঞ্জন কেবল ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং সমগ্র পাড়ায় এক প্রশান্তিময় পরিবেশ তৈরি করত। এই আধ্যাত্মিক অনুশীলনের পরেই শুরু হতো স্কুল বা কলেজের পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিকতা এবং জাগতিক শিক্ষার মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় ছিল।

নারীদের ক্ষেত্রেও এই আধ্যাত্মিকতা প্রাত্যহিক কাজের সাথে মিশে ছিল। রান্নাবান্নার মতো সাধারণ গৃহস্থালি কাজ শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করার রীতিটি ছিল মূলত প্রতিটি কাজকে ইবাদতে পরিণত করার একটি প্রচেষ্টা। এটি বাংলার লোকজ ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে স্রষ্টার স্মরণ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে মিশে থাকত।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও শৈশবের জীবনসংগ্রাম

নব্বইয়ের দশকে আনোয়ারার কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় শিশুদের জীবন ছিল প্রকৃতি এবং কায়িক শ্রমের এক মেলবন্ধন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ামুক্ত সেই সময়ে শৈশব ছিল অনেক বেশি বাস্তবমুখী এবং পরিশ্রমসাধ্য। নব্বইয়ের দশকের গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিক কর্মযজ্ঞ আর বর্তমান সময়ের বিবর্তিত জীবনযাত্রার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। সেই সময়ে কৃষি শ্রমের চিত্রটি ছিল কায়িক পরিশ্রমের এক অনন্য উদাহরণ; যেখানে ভোরের আলো ফোটার আগেই একজন সন্তান তার পিতার সঙ্গে কাঁধে লাঙল-জোয়াল আর এক জোড়া গরু নিয়ে মাঠের দিকে যাত্রা করত। মাটির সোঁদা গন্ধে লাঙলের ফলায় জমি কর্ষণের সেই আদিম দৃশ্যটি আজ বিলুপ্তপ্রায়, যার স্থান দখল করেছে আধুনিক যান্ত্রিক চাষাবাদ ও উন্নত কৃষি প্রযুক্তির প্রলেপ। 

শিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন; একসময় দুই মাইল দীর্ঘ মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে স্কুলে যাতায়াতই ছিল শিক্ষার্থীদের নিয়তি। কিন্তু বর্তমানের যাতায়াত ব্যবস্থা ও যানবাহনের আধুনিকায়ন সেই দূরত্বকে যেমন কমিয়ে এনেছে, তেমনি সহজতর করেছে শিক্ষার্থীদের পথচলা। এমনকি দুর্যোগ মোকাবিলার ধরনেও এসেছে বিস্ময়কর বিবর্তন। আগেকার দিনে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া পাঠ্যবই কিংবা খাতা চুলার তাপে অতি সাবধানে শুকিয়ে নেওয়ার যে প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল, আজ সেই অভাবের স্মৃতি ঢাকা পড়েছে উন্নত মানের রেইনকোটের নিচে। 

বর্তমানে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব আমাদের যাপিত জীবনকে করেছে অনেক বেশি গতিশীল ও আরামদায়ক। নব্বইয়ের দশকে বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে চাল ভাজা, খই বা বীচি খাওয়ার যে পারিবারিক আমেজ ছিল, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক স্বাদের স্থান এখন দখল করে নিয়েছে ফাস্টফুড আর প্যাকেটজাত খাবারের কৃত্রিম আধিপত্য। আধুনিকতার এই যান্ত্রিকতায় আমরা হারিয়েছি মাটির চুলার ঘ্রাণে ভরা সেই অকৃত্রিম খাদ্যাভ্যাস। বর্ষাকালের জলবায়ু গ্রামীণ জীবনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করত। যখন খাল-বিল ও পুকুর প্লাবিত হতো, তখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ‘ঝাল’ (এক প্রকার জাল) নিয়ে মাছ ধরার যে উৎসব শুরু হতো, তা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপ। এই সাম্প্রদায়িক অংশগ্রহণ মানুষের মধ্যে সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করত। বৃষ্টির দিনে ভিজে স্কুল থেকে ফেরার পর চুলার তাপে বই শুকানোর যে অভিজ্ঞতা, তা সেই প্রজন্মের ধৈর্য এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার মানসিকতাকে প্রকাশ করে।

পুরান ঢাকার সুফি ঐতিহ্য ও বকশীবাজার খানকাহর ঐতিহাসিক বিকাশ

চট্টগ্রামের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সাথে পুরান ঢাকার নগরীয় ঐতিহ্যের একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে, যদিও এর প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। বিশেষ করে বকশীবাজার এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরে সুফি সাধনা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ পাদপীঠ হিসেবে পরিচিত। এখানকার সংস্কৃতিতে উর্দু, ফার্সি এবং বাংলা ভাষার এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। বকশীবাজার খানকাহ, যা বর্তমানে ‘ফকির জহুরুল হক মোবারকী’ নামে সুপরিচিত, তা কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক জ্ঞানকেন্দ্র। এটি বকশীবাজারের বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।

হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী (রহ.): এক বহুমুখী প্রতিভা

ঢাকার সুফি সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হযরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী আল-ক্বাদরী (রহ.) ছিলেন একজন যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং একাধারে শায়ের (কবি), সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার এবং প্রখ্যাত বাগ্মী ছিলেন । ১. ভাষাগত দক্ষতা ও সাহিত্য: তিনি শৈশব থেকেই উর্দু, ফার্সি এবং আরবি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তার প্রথম মরমী কবিতা প্রকাশিত হয়। তার সাহিত্যকর্মে আধ্যাত্মিক প্রেম এবং মহানবীর (সা.) প্রশংসামূলক নাত অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে । ২. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংযোগ: ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরের সময় রেসকোর্স ময়দানে তার বক্তৃতার পূর্বে হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী একটি নাত পাঠ করেছিলেন। এছাড়াও রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আল্লামা ইকবালের একটি নাত আবৃত্তি করে সকলকে মুগ্ধ করেন । ৩. উপাধি ও স্বীকৃতি: তার সুমধুর কণ্ঠস্বর এবং কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বুলবুল-এ-বাঙাল’ (বাংলার বুলবুল) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তার রচিত ‘গজলামে হারাম’ কাব্যগ্রন্থটি মুসলিম সুফি সাহিত্যে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

নন্দ কুমার দত্ত রোডের ঐতিহ্য ও বর্তমান খানকাহ

১৯৪৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই খানকাহর কার্যক্রম পরিচালিত হতো নন্দ কুমার দত্ত রোডে। সেই সময়ে এটি ছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের মিলনমেলা। সেখানে নিয়মিত মোশায়েরা (কবিতা পাঠের আসর), জিকির, দরুদ এবং তাসাউফ চর্চা হতো। বিশেষ করে শবে বরাত, শবে কদর এবং দুই ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সেখানে যে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, তা সমগ্র ঢাকার সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করত। বর্তমানে এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছেন বর্তমান গদ্দীনশীন শাহ সুফি সাঈদ আনওয়ার মোবারকী আল-ক্বাদরী। তার তত্ত্বাবধানে বর্তমানেও দৈনিক ৫০০০ বার দরুদ পাঠ এবং প্রতি মাসে আড়ম্বরপূর্ণভাবে ‘গিয়ারবী শরীফ’সহ নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়, যেখানে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সুফি অনুসারীদের মিলনমেলা ঘটে।

পুরান ঢাকার সংগীত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: কাওয়ালী এবং জেনানা আসর

পুরান ঢাকার নিজস্ব সুর ও সাংস্কৃতিক আবহ একসময় সারা বাংলায় পরিচিত ছিল। এখানকার সরু গলি এবং পুরনো দালানগুলোর ছাদের আড্ডায় গাওয়া হতো আধ্যাত্মিক সংগীত। কাওয়ালী ছিল এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ।

কাওয়ালীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষিত

কাওয়ালী কেবল একটি গান নয়, বরং এটি ছিল একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। পুরান ঢাকার মহল্লাগুলোতে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, মিলাদ বা বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে রাতভর কাওয়ালীর আসর জমত। হারমোনিয়াম, তবলা এবং ঢোলকের তালে তালে পরিবেশিত এই গানগুলো মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘রুহানি প্রশান্তি’ তৈরি করত।

একটি বিস্মৃতপ্রায় ঐতিহাসিক তথ্য হলো পুরান ঢাকার নারীদের কাওয়ালী আসর। অতীতে প্রতিদিন বিকেলে মেয়েরা একত্রে বসে তবলা ও ঢোলক সহযোগে উর্দু ও ফার্সি ভাষায় হামদ, নাত ও কাওয়ালী গাইত। এই ‘জেনানা আসর’ গুলো ছিল একান্তই আধ্যাত্মিক এবং ঘরোয়া, যা চট্টগ্রামের গ্রামীণ নারীদের আধ্যাত্মিক চর্চার একটি পরিশীলিত নগর-রূপ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। পুরুষদের আসরেও নিয়মিত মোশায়েরা এবং কাওয়ালী পরিবেশিত হতো, যা ছিল সামাজিক বিনোদনের এক মার্জিত রূপ।

সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারায় আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এর পেছনে নগরায়ন একটি বড় কারণ; এখন খোলা উঠান বা আড্ডার জায়গার অভাবে সমষ্টিগত বিনোদনের স্থান দখল করেছে ব্যক্তিগত ও যান্ত্রিক বিনোদন। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ফলে ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো ভার্চুয়াল মাধ্যমের দাপটে সরাসরি আসরের সেই আধ্যাত্মিক আবেদন ও পারস্পরিক সংযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের রুচিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন; তারা ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিল্পের চেয়ে আধুনিক ব্যান্ড মিউজিক ও ডিজিটাল কনটেন্টের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। এছাড়া অর্থনৈতিক ব্যয়ের আধিক্যও একটি বড় বাধা। কাউয়ালির মতো বড় আসর আয়োজনে উচ্চ খরচ এবং পাড়া-ভিত্তিক সম্মিলিত উদ্যোগের অভাব আমাদের এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে দিন দিন সংকুচিত করে তুলছে।

ঐতিহ্যের সংরক্ষণে বকশীবাজার খানকাহর ভূমিকা ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ

আধুনিকতার এই ঝড়েও বকশীবাজার খানকাহ তার পুরনো গৌরব ও স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমান গদ্দীনশীন শায়খ আনওয়ার মোবারকীর মতে, যদিও কাওয়ালী এবং কাসিদা চর্চা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে, তবুও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা এই ঐতিহ্যকে জিইয়ে রেখেছেন। বকশীবাজারের ১ নম্বর গলিতে এখনও সীমিত পরিসরে কাওয়ালীর আসর বসে, যা ঢাকার সুফি ঘরানার মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থের মতো। পুরান ঢাকার অনেক ঐতিহাসিক সুফি খানকাহ তাদের পুরনো সক্রিয়তা হারালেও বকশীবাজার খানকাহ এখনও প্রতিদিনের জিকির, দরুদ এবং মাসিক গিয়ারবী শরীফের মাধ্যমে সুফি ঐতিহ্যের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে। তবে ডিজিটাল সংস্কৃতির দাপটে এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বকশীবাজারের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

আনোয়ারার গ্রামীণ জনপদে শৈশব কাটানো একজন মানুষের জন্য বকশীবাজারের এই সুফি পরিবেশ এক নতুন মাত্রার বিস্ময় এবং স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আনোয়ারার মাগরিব পরবর্তী জিকির আর বকশীবাজারের ৫০০০ বার দরুদ পাঠ-এই দুইয়ের মধ্যে বাহ্যিক ভৌগোলিক পার্থক্য থাকলেও মূল আধ্যাত্মিক ধারাটি অভিন্ন। গ্রামের বালকদের স্কুল থেকে ফেরার সময় বৃষ্টিতে ভেজা বই-খাতা যেমন তাদের কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি বকশীবাজারের সুফি শায়েরদের উর্দু ও ফার্সি ভাষায় রচিত কাব্যকর্ম তাদের গভীর মননশীলতার পরিচয় দেয়। উভয় ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিকতা ছিল জীবন পরিচালনার মূল শক্তি। চট্টগ্রামে যা ছিল প্রাকৃতিক এবং সরল, পুরান ঢাকায় তা-ই লাভ করেছে এক আভিজাত্যপূর্ণ ও শাস্ত্রীয় রূপ।

সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলার লোকজ ও নগরীয় সুফি ঐতিহ্যের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে: ১. সাংস্কৃতিক স্থায়িত্ব: আধুনিকতার প্রবল স্রোতেও কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বকশীবাজার খানকাহ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২. ভাষাগত ঐতিহ্য: উর্দু ও ফার্সি ভাষার যে চর্চা একসময় ঢাকার আভিজাত্যের অংশ ছিল, তা আজ কেবল সুফি খানকাহগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ৩. সামাজিক সংহতি: এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলো একসময় মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখত। বর্তমানে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সামাজিক বুনন দুর্বল হয়ে পড়ছে ।

উপসংহার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গ্রামীণ জীবন থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের সুফি খানকাহ পর্যন্ত যে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিভ্রমণ, তা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এক অপরিহার্য অংশ। নব্বইয়ের দশকের সেই সরল শৈশব, জিকির, দরুদ আর বৃষ্টির দিনে মাছ ধরার স্মৃতি যেমন আমাদের শেকড়ের পরিচয় দেয়, তেমনি হাফেজ জহুরুল হক মোবারকীর মতো মনীষীদের কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক অবদান আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করে। আজকের আধুনিক যুগে যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুততর করেছে, সেখানে বকশীবাজার খানকাহর মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো আমাদের 'রুহানি প্রশান্তি'র উৎস হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই ঐতিহ্যগুলোকে কেবল নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা হিসেবে নয়, বরং আমাদের স্বকীয়তা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল বাংলার এই সমৃদ্ধ সুফি ও সাংস্কৃতিক ধারাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। ঐতিহ্যের এই বহমান ধারা আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উন্নতির পাশাপাশি আত্মিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতিই একটি জাতির প্রকৃত সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলার সুফি ঐতিহ্য   সাংস্কৃতিক বিবর্তন   কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close