বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয় চট্টগ্রামকে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, উদীয়মান শিল্পাঞ্চল ও পর্যটন নগরীর প্রবেশদ্বার এই বন্দরনগরী। কিন্তু এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের বিপরীতে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখন এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের লাখ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা, যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করছেন, তাদের যাতায়াতের নূন্যতম স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটে শাহ আমানত বিমানবন্দরে একটি আধুনিক দ্বিতীয় টার্মিনাল স্থাপন ও রানওয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এখন আর কেবল দাবি নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
অব্যবহৃত জমির সঠিক ব্যবহার:
একটি বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভূমি অধিগ্রহণ। কিন্তু শাহ আমানত বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় আশীর্বাদ যে, বর্তমান টার্মিনালের পূর্ব দিকে এক বিস্তীর্ণ জমি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ চাইলে কোনো প্রকার বাড়তি ভূমি জটিলতা ছাড়াই এই জায়গায় একটি সুবিশাল ও অত্যাধুনিক দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করতে পারে। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এই জায়গাটিকে একটি বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা সম্ভব।
প্রয়োজন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা:
বর্তমানে একটি মাত্র টার্মিনাল দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে গিয়ে যাত্রীদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় টার্মিনালটি এমনভাবে নকশা করা প্রয়োজন যেখানে অন্তত ৪-৬টি মাল্টি-লেভেল বোর্ডিং ব্রিজ থাকবে। বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের সুবিধার জন্য টার্মিনালের ভেতরে ওয়াকিং বেল্ট স্থাপন করা জরুরি। এছাড়া প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ-লাগেজ পেতে দেরি হওয়া। পর্যাপ্ত আধুনিক লাগেজে বেল্ট স্থাপন করলে যাত্রীদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।
নিরাপদ রানওয়ে ও ক্যাট-টু সিগন্যাল সিস্টেম:
যাত্রী সুবিধার পাশাপাশি বিমানবন্দরের কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে রানওয়েতে যে সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু আছে, তা অত্যন্ত সেকেলে। বৈরী আবহাওয়া কিংবা ঘন কুয়াশার সময় এই সিস্টেমে বিমান অবতরণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক। অনেক সময় দৃশ্যমানতা কমে গেলে ফ্লাইটগুলো অন্য দেশে বা ঢাকাতে ডাইভার্ট করতে হয়, যা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য ব্যয়বহুল ও যাত্রীদের জন্য হয়রানিমূলক। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে রানওয়েতে অবিলম্বে ‘ক্যাট-টু সিগন্যাল সিস্টেম’ পদ্ধতির আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করলে যে কোনো আবহাওয়ায় বিমান নিরাপদে ওঠানামা করতে পারবে।
আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি ও রুট সম্প্রসারণ:
দ্বিতীয় টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রামের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সরাসরি রুট বাড়ানো সম্ভব হবে। ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাথে নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলে চট্টগ্রাম একটি রিজিওনাল এভিয়েশন হাবে পরিণত হবে। এতে করে কেবল যাত্রী পরিবহন নয়, বরং কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে পাঠানো সহজ হবে।
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা:
চট্টগ্রামের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে বিমানবন্দরের এই আধুনিকায়ন প্রকল্প এখন জাতীয় গুরুত্বের দাবি রাখে। চট্টগ্রামের সাংসদদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান, আপনারা এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি মহান জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে উত্থাপন করুন। সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে শাহ আমানত বিমানবন্দরকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া হোক। প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো টাকায় দেশ চলছে, তাদের একটু সুন্দর যাতায়াত ব্যবস্থা উপহার দেওয়া কি খুব বেশি চাওয়া? চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি ও সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিলে শাহ আমানত বিমানবন্দর হবে দেশের গর্ব ও অর্থনীতির নতুন মাইলফলক।
কেকে/এমএ