জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এর পর থেকে দলটির মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যান। কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যান, আবার কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। এরই মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরবর্তী সময়ে ছাত্রসংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ এক নতুন ও সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রকাশ্যে আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা জনরোষের মুখে পড়ার ভয়ে কর্মীরা আত্মগোপনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোনো কোনো সময়ে ছাত্রলীগ ঝটিকা মিছিল করছে। এতে নেতাকর্মীরা ধরপাকড়ের শিকারও হচ্ছেন। সম্প্রতি দেশের রাজনীতির মাঠে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনটির পুনর্গঠন ও কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গোপন কমিটি গঠনের মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনটি স্থবিরতা কাটিয়ে আবার রাজনীতিতে সচল হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে আগামী এক মাসের মধ্যে সারা দেশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঝটিকা মিছিল ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। কখনও কখনও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে বেপরোয়া আচরণ, ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠনটি আদর্শিক রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ‘পাওয়ার পলিটিক্স’ বা ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। তবে ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে তাদের সংস্কার, জবাবদিহি এবং ক্যাম্পাসে সহনশীল রাজনীতির পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারী ও সাংগঠনিক সংকটের বিষয়টি অনুধাবন করেছেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও। তারা বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারী বা ‘হাইব্রিড’ কর্মীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যারা সংগঠনের বদনাম করেছে। সংগঠনের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফায়দা নিয়েছে, যা গণঅভ্যুত্থানের পর প্রমাণিতও হয়েছে বলে মনে করেন নেতারা।
সারা দেশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ
আগামী এক মাসের মধ্যে সারা দেশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। গত শুক্রবার সংগঠনটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের জরুরি সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানো যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্তর্গত যেসব জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ (কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের আওতাধীন সাংগঠনিক জেলা মর্যাদার ইউনিট) শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি, সেসব ইউনিটকে আগামী ১৭ মে’র মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন কার্যক্রম সম্পন্ন করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের দপ্তর সেলে প্রেরণ করার নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের নেতৃবৃন্দকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটে সার্বিক তত্ত্বাবধান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সাত থানায় নতুন কমিটি
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের অন্তর্গত সাতটি থানার কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি থানায় এক বছরের জন্য নতুন কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকি ছয়টি থানায় আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। গত শুক্রবার ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সাগর আহম্মেদ শামীম স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। ওই জরুরি বিজ্ঞপ্তিটি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হয়েছে। নতুন কমিটিগুলো হলো—ঢাকা মহানগর উত্তরের পল্লবী থানা, রূপনগর থানা, উত্তরা পশ্চিম থানা, ভাষানটেক থানা, বিমানবন্দর থানা, কাফরুল থানা এবং উত্তরখান থানা।
সারা দেশে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিভিন্ন থানা কমিটি গঠন এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্পন্ন করতে কেন্দ্রীয় যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এ ব্যাপারে জানতে কথা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে। তারা বলছেন, ছাত্রলীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি এবং সংগঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে কমিটিগুলো গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি পদে আছেন—এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা স্থবির হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বর্তমানে সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। তবে এখন সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছি। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে আমরা মাঠে নামছি।”
প্ল্যাকার্ড হাতে ছাত্রলীগ নেতার অবস্থান
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতা। গতকাল রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় তিনি একাই দাঁড়িয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘ছাত্রলীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কর, করতে হবে’। তার নিচে লেখা—‘প্রতিবাদে: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ’। ছাত্রলীগের এই নেতার নাম ওয়াহিদুল আলম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক। ওয়াহিদুল আলম বলেন, “বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি। একই সঙ্গে দেশে চলমান ছাত্রলীগের ওপর ‘মব’ সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমরা কোনোভাবেই স্বৈরাচারী শক্তির নেতাকর্মীদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেব না। যেহেতু তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান, তাই এ বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থান বজায় রাখব।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু)-এর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠনটি বহু আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা বর্তমানে আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা লুকিয়ে-গোপনে বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে।”
ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। গত শুক্রবার দুপুরে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুয়াইশ অক্সিজেন সড়কের অনন্যা আবাসিক এলাকায় এই মিছিল হয়। একই দিনে চন্দগাঁও থানা এলাকায় এবং বরিশাল মহানগরীর সদর রোডেও তাদের ঝটিকা মিছিল ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে তারা মুখোশ পরে দলীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানায়। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, ঝটিকা মিছিলে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যান্যদের শনাক্তের কাজ চলছে।
‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’-এর ক্ষমতাবলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই মাস পর ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সংগঠনটির বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার ও সরকার পতন আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতা ‘হত্যা’ ও অসংখ্য মানুষের ‘জীবন বিপন্ন’ করা এবং বিভিন্ন সময় ‘সন্ত্রাসী’ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
কেকে/এলএ