মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
পাহড়ে সুপেয় পানির সংকট : র‌্যাম পাম্পে হতে পারে সমাধান
আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবান একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার, বীপরিত দিকে এটি মানুষের বসবাসের জন্য এক কঠিনতম যায়গা। পাহাড়ে মেঘের ছোঁয়া আর সবুজের বিস্তৃত চাদরের আড়ালে লুকিয়ে আছে সেখানকার জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের লড়াই সংগ্রাম, বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির জন্য লড়াই। এই লড়াই এতটাই গভীর যে, অনেক সময় তা চোখে পড়ে না, কিন্তু জীবনকে প্রতিনিয়ত ক্লান্ত করে তোলে। 

সম্প্রতি বান্দরবান সফরে গিয়ে এই সংকটকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে যে জায়গাটি পর্যটকদের কাছে স্বর্গের মতো মনে হয়, সেখানে বসবাসকারী মানুষের জন্য প্রতিদিনের জীবন মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এই সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি। উঁচু নিচু পাহাড়, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা পানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। সমতলের মতো এখানে গভীর নলকূপ বসানো বা পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা সহজ নয়। ফলে মানুষ নির্ভর করে ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা মৌসুমি পানির উৎসের ওপর, যা বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে প্রায়ই শুকিয়ে যায় বা দূষিত হয়ে পড়ে।

বান্দরবানের চিম্বুক, থানচি, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, লামাসহ বিভিন্ন উপজেলার শত শত পাড়ায় এই সংকট আরও প্রকট। হুকু খুমী পাড়া, সাখয়উ পাড়া, খেসাপ্রু পাড়া, রুংসোলা পাড়া কিংবা মতি ত্রিপুরা পাড়ার মতো এলাকায় মানুষের প্রতিদিনের জীবন শুরু হয় পানির সন্ধানে। 

অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়, আবার পানি নিয়ে উপরে উঠতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, শারীরিকভাবেও অত্যন্ত কষ্টকর। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। পাহাড়ি সমাজে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই বর্তায়। দিনের একটি বড় অংশ তারা ব্যয় করে শুধু পানি আনার পেছনে। এতে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। 

শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, কারণ তাদেরও পরিবারের কাজে সাহায্য করতে হয়। স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও এই সমস্যা ভয়াবহ। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকেই ঝিরির পানি বা অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, যার ফলে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, আমাশয়, ত্বকের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। 

চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলোও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বন উজাড়, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত ধরন এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। ফলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন একটি সমাধান, যা হবে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কম খরচে বাস্তবায়নযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই। সেই জায়গা থেকে র‌্যাম পাম্প প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প হিসেবে সামনে আসে।
র‌্যাম পাম্প এমন একটি প্রযুক্তি, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের শক্তি ব্যবহার করে কোনো বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ছাড়াই নিচু স্থান থেকে উঁচু স্থানে পানি তুলতে সক্ষম। পাহাড়ি এলাকায় যেখানে ঝিরি বা ছোট জলধারা রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি একবার স্থাপন করলে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলক কম।

বান্দরবানের দুর্গম পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে র‌্যাম পাম্প স্থাপন করা গেলে শত শত পরিবার উপকৃত হতে পারে। এতে করে মানুষকে আর প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি আনতে হবে না। তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে, যা তারা অন্য উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিশেষ করে নারীদের জীবনে এর প্রভাব হবে অত্যন্ত ইতিবাচক।

তবে শুধু একটি প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, পানির উৎস এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। এর পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হলেও সেই পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ছোট আকারের রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম চালু করা গেলে অনেকাংশে পানির সংকট কমানো সম্ভব। পানির উৎস সংরক্ষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝিরি, ঝর্ণা এবং পাহাড়ি জলাধারগুলোকে রক্ষা করতে হবে। 

বন উজাড় বন্ধ করা, পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণ করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এছাড়া স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহারের গুরুত্ব, পানি সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। 

কমিউনিটি ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে এই উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর হবে। বান্দরবানের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যখন প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত এই সৌন্দর্যের আড়ালে মানুষের যে কষ্ট, তা উপেক্ষা করা যায় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

পাহাড়ি জনপদের বিশুদ্ধ পানির সংকট কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সচেতনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। সবশেষে বলা যায়, বান্দরবানের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। তাদের এই সংগ্রামকে সহজ করতে পারাই আমাদের দায়িত্ব। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা তাদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close