মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা দর্শন
আহমেদ দাভুতোগলু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনাটি যে ব্যর্থ হয়েছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। দুই পক্ষের অনড় অবস্থান এবং কঠোর বাগাড়ম্বর শুরু থেকেই একটি অর্থবহ অগ্রগতির সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তুলেছিল। 

শোনা যাচ্ছে, দ্বিতীয় দফার আলোচনার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, কিন্তু সেটিও ব্যর্থ হতে বাধ্য। কেননা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারবে না; তবে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি আঞ্চলিক কাঠামো দাড় করানো গেলে সেটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  

যে কোনো কার্যকর চুক্তিতে একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে : এটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি স্থাপন করবে এবং প্রতিটি পক্ষকে এমন একটি ফলাফল দেবে যা তারা নিজ দেশে ‘সাফল্য’ হিসেবে দেখাতে পারবে। কিন্তু এখানে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা আরও জটিল হয়ে পড়েছে, কেননা বাইরের শক্তির, বিশেষ করে ইসরায়েলের পরোক্ষ কিন্তু প্রভাববিস্তারি ভূমিকার কারণে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সংকট কোনো একক বিরোধের ফল নয়; বরং এটি চারটি সংকটের সংমিশ্রণ : হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মিসাইল ও প্রক্সি যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অভাব এবং অমীমাংসিত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব। এর যে কোনো একটির অগ্রগতি বাকিগুলোর সমান্তরাল অগ্রগতি ছাড়া অসম্ভব। 

হরমুজ প্রণালি বর্তমানে সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যদিও এটি এখন খুলে দেওয়া হয়েছে, আবার বন্ধ করাও হয়েছে। ফলে ইরানের এই অনিশ্চিত আচরণ এবং সাময়িক অবরোধের বিপরীতে পালটা মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রমাণ করেছে যে, পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং দ্রুত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কতটা বেশি। একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হতে পারে তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীদের একটি জোটের অধীনে এই প্রণালিকে সাময়িকভাবে ন্যস্ত করা। 

সুনির্দিষ্ট শর্তাবলীর অধীনে তারা নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি যৌথ সামুদ্রিক মিশন পরিচালনা করতে পারে। তবে এমন একটি ব্যবস্থার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান (ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিত অভিযানসহ) অবিলম্বে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বিনিময়ে ইরানকে নৌ-নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং প্রতিবেশীদের আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের এ ধরনের ব্যবস্থাকে সমর্থন করার জোরালো কারণ থাকবে।

বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য এ উদ্যোগটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের আনুষ্ঠানিক সমর্থন পেতে হবে। এ কাঠামোটি কেবল তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতাই নয়, বরং হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা তৈরির পথ প্রশস্ত করতে পারে। 

যদিও ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা একটি বড় বাধা, তবে সমাধানের পথ এখনো রয়েছে যদি উভয় পক্ষ একটি বিনিময়মূলক পদ্ধতি গ্রহণ করে। ইরানকে পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, আর যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির অধিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই পারস্পরিক স্বীকৃতি উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি করার সুযোগ দেবে।

২০১০ সালের তেহরান চুক্তি যা তুরস্ক এবং ব্রাজিল আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতায় মধ্যস্থতা করেছিল একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। তৎকালীন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমি এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিলাম, যেখানে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির বিনিময়ে ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তুরস্কে জমা রাখতে হয়েছিল। সেই ব্যবস্থার একটি আধুনিক সংস্করণ পুনরায় তুরস্ক বা পাকিস্তানের মাধ্যমে করা যেতে পারে। 

একবার ঐকমত্য তৈরি হয়ে গেলে, ইসরায়েলের কাছে থাকা অস্ত্রসহ পুরো অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরানকে তার ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়, তবুও অগ্রগতি সম্ভব। 

মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রক্সি যুদ্ধ মোকাবিলা এবং একটি অংশীদারত্বমূলক নিরাপত্তা কাঠামোর অভাব। এ সমস্যা কেবল মার্কিন-ইরান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। একটি বহুমুখী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির জন্য প্রথমে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরির ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিতে হবে, যেখানে তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সুবিধা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করবে। একটি যৌথ কমিশন তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমিয়ে একটি স্থায়ী ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

দ্বিতীয় স্তরটি হলো একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরাম, যেখানে তুরস্ক, পাকিস্তান, মিশর, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, ইয়েমেন এবং এর সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরান থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি কাঠামোগত আঞ্চলিক সংলাপে পরিণত হতে পারে, যা ১৯৭৫ সালের হেলসিংকি অ্যাকর্ডস-এর মধ্যপ্রাচ্যয়ী সংস্করণে রূপ নেবে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইউরোপের মতো এখানেও স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সংযম এবং যাচাইকরণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে একটি কাঠামো সংঘাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। 

১৯৯০ সালের ‘ট্রিটি অন কনভেনশনাল আর্মড ফোর্সেস ইন ইউরোপ’ দেখিয়েছিল যে, অতি বিভক্ত অঞ্চলগুলোও সামরিক সক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণে একমত হতে পারে যখন পারস্পরিক ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকৃত হয়। কিন্তু যে কোনো টেকসই আঞ্চলিক ব্যবস্থার জন্য ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান করতে হবে। 

ফিলিস্তিনিদের আত্মনির্ণয়ের অধিকার অস্বীকার করা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার একটি মৌলিক কারণ। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ছয় দশকের দখলদারিত্ব এবং গাজায় চলমান সামরিক অভিযান একটি স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিবেশের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মতো এই বিরোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কেবল ক্ষোভকেই বাড়িয়ে তুলেছে। একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এখন জরুরি। ইসরায়েলকেও এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে, তবে বিনিময়ে তাকে ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি পূর্ণ সার্বভৌম ও জাতিসংঘ সদস্যপদপ্রাপ্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তার দ্বিতীয় মেয়াদে নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার আশা নিয়ে প্রবেশ করেছেন, এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। তিনি কি একটি লক্ষ্যহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন যা পুরো বিশ্বকে বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত করার ঝুঁকি রাখে, নাকি তিনি একটি কূটনৈতিক সাফল্যের সুযোগ লুফে নেবেন? একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের উচিত উত্তেজনা প্রশমনে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা। 

২০০৫ সালে তুরস্ক ও স্পেন কর্তৃক প্রবর্তিত এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া ‘অ্যালায়েন্স অফ সিভিলাইজেশনস’-কে পুনরুজ্জীবিত করা এ প্রচেষ্টার জন্য একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। এর অধীনে একটি শীর্ষ সম্মেলন আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকারের সংকেত দেবে।  তাই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে অন্যথায়, সংঘাতের এই চক্র চলতেই থাকবে এবং তা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। 

লেখক : তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী (২০১৪-১৬) এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০০৯-১৪)

অনুবাদ : ফরহাদ নাইয়া

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close