শৈশব ও কৈশোরকালীন সময়ে দেখেছি, কোথাও বেড়াতে গেলে বা বাড়িতে কেউ এলে, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত গুরুজনের দেখা হলে, লেখাপড়াসহ বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা শেষে একটি সাধারণ প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে চাইতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে? ছোটবেলায় যখন সেই রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম, তখন কোন প্রকার সময়ক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক বলে দিতাম রেলওয়ে অফিসার হব।
এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য বাংলা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা শিখতে হত; যেমন- পেশাবৃত্তি নির্ধারণ, কর্মক্ষেত্র নির্বাচন, জীবনের লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি। অন্যদিকে একইভাবে ইংরেজি বিষয়ে ছিল- গোয়েল অব ফিউচার, অ্যাম্বিশন কিংবা এইম ইন লাইফ।
শুধু রচনায় নয়, চিঠি এবং লেটারেও থাকতো বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও তা জানিয়ে বন্ধু বা পিতার নিকট পত্র লিখ। তখন অধিকাংশ গাইড বা সহায়ক বইয়ে লেখা থাকতো কৃষিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা শিক্ষক হবার কথা। আমার মা ওই রচনা-চিঠিতে, সংশোধন করে নিত অথবা নোট করে দিত ‘রেলপথ কর্মকর্তা’ হবার কথা।
আমাদের পরিবারের পরিকল্পনা বা আশা ভরসা ছিল, আমরা দুই ভাইয়ের মধ্যে (আমাদের বোন নেই) আমি রেলওয়েতে চাকরি করব, আর আমার ছোট ভাইকে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানাবে। শিক্ষাজীবনে আমি মেধাহীন পশ্চাৎমুখী ছাত্র না হলেও সেরা ছাত্র ছিলাম না, তবে আমার ভাই ছিল সেরাদের মধ্যে সর্বকালের সেরা ছাত্র। অবশেষে ছোটভাই সেই সময় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স পেয়ে গেল। আমাদের ইচ্ছায় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিানিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়ে পরবর্তীতে সে প্রকৌশলী হয়ে সকলের স্বপ্নপূরণ করতে সমর্থ হল।
অন্যদিকে আমি বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রতিযোগিতামূলক অনেকগুলো লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চল্লিশ শতাংশ পোষ্য কোটা নিয়েও রেলকর্তা হবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না! কেন পারলাম না, এই বিষয়ে তৎকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বেশি কিছু বলতে চাই না। যারা জানে তারা জানে।
যাইহোক, এখন এই পর্যন্ত পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন রেলওয়ে অফিসার হবার স্বপ্ন ছিল? প্রসঙ্গক্রমে না বললে নয়; আমার পূর্ববর্তী চার পুরুষ ছিলেন রেলওয়ে চাকরিজীবী। সেই ব্রিটিশ আমলে যখন বর্তমান বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ববর্তী নাম ছিল ইস্টার্ন বেঙ্গল রেল কোম্পানি, তখন রেলের চাকরি করতেন আমার দাদু’র দাদু, অর্থাৎ আমার বৃদ্ধ প্রপিতামহ; যার নাম ছিল ‘দুর্গাচরণ’।
এরপর সেই দুর্গাচরণের ছেলে ‘হরিশচন্দ্র’ চাকরি করতেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে। আর হরিশচন্দ্রের ছেলে ছিল ‘অর্জুন’। তিনিও ছিলেন পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের চাকরিজীবী। অর্জুনের ছেলে হচ্ছে ‘অনুকূল’। তিনিও ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা, বর্তমানে অবসরে আছেন। আবার এই অনুকূলের ছেলে ‘লিটন’ যে এই নিবন্ধের লেখক; অর্থাৎ আমি নিজেই।
আর এতসব পূর্বপুরুষের ইতিহাস টেনে ব্যাখ্যা দেবার কারণ হচ্ছে, এই সেই সিআরবি এলাকা যেখানে আমাদের পুরানো পূর্বপুরুষদের যেমন বিচরণ ছিল তেমনি আমাদের বর্তমান প্রজন্মেরও বিচরণক্ষেত্র। বলতে গেলে একেবারে ইনফেন্ট অবস্থা থেকে পিতার কোলে করে আসা যাওয়া এই সিআরবি ভবন এলাকায়। তাই এই এলাকাটি আমাদের কাছে আপন ভুবন মনে হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রেলগাড়ি করে বিনা টিকিটে (পাস থাকাতে) আসা যাওয়ার কারণে, রেলগাড়ি, রেলওয়ের স্থাপনা বা রেলের জায়গাজমি দেখলে আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নিজেদের সম্পত্তির মতো একপ্রকার আবেগ সৃষ্টি হয়, নিজের মনে হয়! তাই এই সম্পদে কোনো প্রকার দখল-বেদখল বা সমস্যা সৃষ্টি হলে, পৈত্রিক সম্পত্তিতে আঘাত মনে করে এবং দু’হাতে আগলিয়ে রক্ষা করতে ইচ্ছে হয়।
গত কয়েকবছর আগে এই সিআরবি এলাকাটি সর্বসাধারণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই এলাকায় ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ আর রেলওয়ের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক, পাঁচশ শয্যার একটি হাসপাতাল হবার কথা ছিল। ওই সময় করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, বাঁচার জন্যে অন্যসব থেকে জরুরি প্রয়োজন হাসপাতাল নির্মাণ।
তখন ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড চট্টগ্রামে এই জরুরি কাজটি করতে যাচ্ছিল। এখানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ আসন বিশিষ্ট একটি মেডিকেল কলেজ, ৫০ আসনবিশিষ্ট নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ ছিল। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন উঠেছে এটি এই এলাকায় কেন; যে এলাকায় রয়েছে প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশ আর ১৮৭২ সালে নির্মিত বর্তমান চট্টগ্রামের সর্ব প্রাচীনতম ভবন এই সিআরবি।
এছাড়া ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে যুববিদ্রোহীরা অর্থ সংগ্রহের জন্যে অভিযান চালিত এটি ঐতিহাসিক একটা স্থানও বটে। দীর্ঘ ৫ বছর পরে এখন একই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান রেলপথ মন্ত্রী জনাব শেখ রবিউল আলম এই এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের নিমিত্তে পরিদর্শন করার কথা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় নাগরিক সমাজ। যদিও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র জনাব শাহাদাত হোসেন বলেছেন, সিআরবি এলাকায় কোন স্থাপনা নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় হাতে গোনা যে কয়টি প্রাকৃতিক নৈসর্গিক এলাকা রয়েছে তার মধ্যে সিআরবি সন্নিহিত এলাকায় এই সাত রাস্তার মোড় একটি, যা অধুনা শিরিষতলা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। পাহাড়ঘেরা প্রাচীন শতবর্ষী বৃক্ষরাজি সুশোভিত ছায়া ও মায়া মিশিয়ে মাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে চট্টলবাসীকে। ইট পাথরে দুর্বিসহ নগর জীবনে নিক্ষিপ্ত মানুষ প্রতিদিন বিক্ষিপ্তভাবে প্রশান্তির অন্বেষায় ছুটে আসে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকায়।
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার এই সিআরবি সংলগ্ন শিরিষতলায় বিশ্রাম, যেন যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রনা থেকে খানিক মুক্তির উপায়। এখানে আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু ছোট বড় পাহাড় টিলা বনবনানী সমৃদ্ধ বিরাট এলাকাটি, ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে অঘোষিত পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে।
এই সিআরবি বা সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে, এক সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর বা হেডকোয়ার্টার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল। এখন প্রধানদপ্তর এখান থেকে সরিয়ে ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে, সরকারি দাপ্তরিক কাজের পরিধি কিছুটা কমে যায়। কিন্তু এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জুলুস তিল পরিমাণ কমেনি। অধিকন্তু কালক্রমে হয়ে উঠেছে নগরবাসীর অতি প্রাণপ্রিয় প্রাঙ্গণ।
বর্তমান সময়ে সিআরবি সংলগ্ন এই শিরিষতলায় বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালন, বৈশাখীমেলা উদযাপন, বসন্ত বরণ উৎসব, বিভিন্ন জাতীয় দিবস, লোকজ সংস্কৃতি পালনসহ সামাজিক সাংগঠনিক কর্মসূচি অনুষ্ঠানিকভাবে পালনের পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। তাই এখানে হাসপাতাল নির্মাণে যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা অমূলক কিছু নয়।
আমরা চট্টগ্রামবাসী হাসপাতাল চাই। চট্টগ্রামে এমন কোন সচেতন নাগরিক নেই যে হাসপাতাল নির্মাণের মতো এমন মহৎ কাজের বিপক্ষে দাঁড়াবে বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে! তবে মূলকথা হচ্ছে এই সিআরবি এলাকায় কেন? চট্টগ্রাম নগরে হাসপাতাল নির্মাণের মত আরও স্থান রয়েছে, রেলওয়ের অন্যত্র নিজস্ব জায়গাও রয়েছে, যেখান থেকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য হস্তান্তর করতে পারে।
এই এলাকা থেকে যেখানে প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধিত বিনা পয়সায় অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মেডিক্যাল বানিয়ে সিলিন্ডার ভর্তি অক্সিজেন, টাকা দিয়ে কেনা কারও কাম্য নয়। এছাড়া বলতে গেলে সিআরবি তো নিজেই একটি হাসপাতাল, এখানে প্রাকৃতিক অক্সিজেন পাওয়া যায়, রোগ প্রতিরোধ করার জন্যে হাঁটার সুযোগ পায়। তাছাড়া এখানে অনেক ঔষধি গাছও রয়েছে।
ওই সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রতিবছর রেলওয়েকে প্রথমদিকে দেড়কোটি টাকা করে দিবে, এরপর ৭ম বছর থেকে পরবর্তী আরও পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত ১০% হারে এই টাকা বৃদ্ধি পাবে। এখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব লভ্যাংশ রেখে যদি বিপুল পরিমাণ টাকা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দিতে পারে, তাহলে নিশ্চয় এত টাকা রোগী বা সাধারণ জনগোষ্ঠী থেকে নেবে! হাসপাতাল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, এই অবস্থায় সেটা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান না হয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে না তো! আর সত্যিই এই হাসপাতাল যদি সাধারণ জনগণের জন্যে নির্মাণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ ফ্রি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা ও ন্যায্যমূল্যে ইনভেস্টিগেশন করার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ করা হোক এটি দরিদ্র জনসাধারণের জন্যে নির্মিতব্য হাসপাতাল। তখন চট্টগ্রামের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে ওই এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করা যাবে কি যাবে না!
এইদিকে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিকগণ প্রদত্ত বিবৃতি থেকে জানতে পারলাম, এই এলাকার সিআরবি ভবনকে সংবিধানে ২য় ভাগের ২৪ ধারা অনুযায়ী ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে ‘জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮’ এর ৩.১৭ ধারায় আবাসন, নগরায়ন, গৃহায়ন সম্পর্কিত বিষয়ে লেখা আছে; সারাদেশে খেলার মাঠ, পার্ক, বাগান, নার্সারি, উন্মুক্তস্থান ও ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাসমূহ সংরক্ষণে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে উন্নয়ন কাজে অগ্রসর হতে হবে।
এইদিকে ২০০০ সালে প্রণীত ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকায় খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ’ আইন রয়েছে। এছাড়া জীববৈচিত্র্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ সম্পর্কিত আরো অনেক আইন ও নীতিমালা রয়েছে। এত সব আইন নীতিমালা উপেক্ষা করে হাসপাতাল নির্মাণ পরিকল্পনা কিভাবে আসে!
আগামীতে যাতে সিআরবি এলাকায় কেউ কোনো প্রকার নির্মাণ পরিকল্পনা করতে না পারে, এবং পরিবেশের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে, তার জন্যে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর এই জন্যে শতবর্ষী বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এলাকাটিকে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস