রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ      ঢাবিতে ভর্তি আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে, পরীক্ষা শুরু ৫ ডিসেম্বর      সব বেসরকারি দাখিল-আলিম মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটি বাতিল      ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৭০ টাকা      ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু      দুবাইয়ের জেল থেকে মুক্তি পেলেন বেনজীর      ঢাকার চারপাশের নৌ-পথ সচলের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্বালানি ইস্যুতে বরাবরের মতন লাভের অঙ্ক বাড়ছে, কমছে কেবল সাধারণ মানুষের স্বস্তি
মো. সোহানুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:১৫ পিএম

২০২২ সালের আগস্ট এক অদ্ভুত সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে হঠাৎ করেই অকটেনের দাম ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হলো। যেন এক ঝটকায় জ্বালানির আগুন ছড়িয়ে পড়ল পুরো বাজার ব্যবস্থায়। পরিবহন ভাড়া বাড়ল, পণ্যের দাম বাড়ল, আর নীরবে বেড়ে গেল মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার ব্যয়।

অথচ, সেই একই মাসেই আবার জ্বালানির দাম কমানো হলো প্রথমে ৫ টাকা, পরে ধাপে ধাপে আরও কিছুটা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই কমার প্রতিফলন কোথাও দেখা গেল না। বাস ভাড়া কমল না, পণ্যের দাম কমল না। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যে ভাড়া ৫০০ টাকা ছিল, তা এক লাফে ৭০০ টাকায় পৌঁছালো আর সেখানেই স্থির হয়ে রইল, যেন সেটাই নতুন বাস্তবতা।

ফলে জ্বালানির দাম কমানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে এক প্রকার অর্থহীন হয়ে উঠল। কারণ বাস্তব জীবনে তাদের ব্যয় একটুও কমেনি। বরং সেই সময় থেকেই মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বাজার ব্যাবস্থার এক ধরনের অদৃশ্য শক্তি ‘সিন্ডিকেট’ নিজেদের আধিপত্য আরও সুসংহত করে তোলে।

২০২৬ সালে এসে আবারও জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো, কিন্তু সেই দাম ঘুরেফিরে ২০২২ সালের আগস্টের পর্যায়েই অবস্থান করছে। প্রশ্নটা এখানেই যদি তখনকার সেই দামের ভিত্তিতেই পরিবহন ভাড়া স্থায়ীভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে আজ আবার নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা কোথায়? এতদিন ধরে তো সেই উচ্চমূল্যের জ্বালানির যুক্তিতেই জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। তাহলে কি এই বাড়তি দাবি কেবলই এক ধরনের সংগঠিত শোষণ?

এদিকে জ্বালানি খাতে আরেকটি পরস্পরবিরোধী চিত্রও দেখা যাচ্ছে। একদিকে পাম্পে দীর্ঘ লাইন, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকারে তেল উপচে পড়ছে। তথ্য বলছে, দেশের মোট চাহিদার বড় অংশই দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব। তবুও সেই তেল গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে এক অদ্ভুত দ্বৈত সংকট সৃষ্টি হয়েছে অভাবের ভান, প্রাচুর্যের বাস্তবতা।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই আবার ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে যখন অতিরিক্ত মজুত রয়েছে, তখন মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে এ কি বাস্তব সংকট, নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এক অর্থনৈতিক নাটক?

পরিবহন খাতের হিসাব আরও বিস্ময়কর। ঢাকা থেকে কক্সবাজার ৩৮০ কিলোমিটারের পথে প্রতি কিলোমিটারে ৪ টাকা করে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব। এতে একজন যাত্রীর ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫২০ টাকা। অথচ জ্বালানির প্রকৃত অতিরিক্ত ব্যয় হিসাব করলে দেখা যায়, পুরো বাসের খরচ বৃদ্ধি হয় মাত্র কয়েকশ থেকে এক হাজার টাকার মতো। সেখানে ৩২ জন যাত্রীর কাছ থেকে যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হবে, তা মালিকপক্ষের জন্য বিপুল মুনাফায় পরিণত হবে।

অর্থনীতির এই অসমীকরণ শেষ পর্যন্ত গিয়ে আঘাত করে সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় সাধারণ মানুষের জীবনে। আলুর দাম কয়েক টাকা বাড়লেই যেখানে চোখে জল আসে, সেখানে তেল, ডাল, আটা, চাল সবকিছুর সম্মিলিত মূল্যবৃদ্ধি মাস শেষে বাড়তি হাজার টাকার বোঝা চাপিয়ে দেয়।

এই অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসে? উত্তরটি নিঃশব্দ, কিন্তু নির্মম। সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজন কমিয়ে দেয়। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেয় না, চিকিৎসা সম্পর্কিত টেস্ট করায় না, ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকে। যেখানে ক্ষমতাবানরা সামান্য অসুস্থতায় বিদেশমুখী হয়, সেখানে সাধারণ মানুষ নিজের যন্ত্রণা নিজের মধ্যেই গিলে ফেলে অর্থের অভাবে, বিকল্পের অভাবে।

এভাবেই অর্থনীতির প্রতিটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত, প্রতিটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, প্রতিটি কৃত্রিম সংকট শেষ পর্যন্ত গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের উপর এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করে। আর সেই চাপই ধীরে ধীরে রূপ নেয় নীরব এক সংগ্রামে, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে কিন্তু স্বস্তিতে নয়, কেবল প্রয়োজনের তাগিদে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close