মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
চট্টগ্রামের বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) দরগাহ : মিথ ও বাস্তবতার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সুলতানুল আরেফিন হযরত বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) মাজার দেখি, তখন ভক্তি, রূহানি চেতনা ও ইতিহাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রামাণিক দলিল সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ইরানের বাস্তাম শহরে শায়িত আছেন ও তাঁর সমাধি সেখানেই অবস্থিত। 

তবে চট্টগ্রামের এই পাহাড়ের গুরুত্ব বা এর রূহানি প্রভাবকে নিছক জনশ্রুতি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। গভীর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে এই অমীমাংসিত রহস্যের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পাওয়া যায়, যা একজন গবেষকের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) সরাসরি বা শারীরিক আগমনের চেয়েও শক্তিশালী একটি সত্য হলো তাঁর আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারীদের পদচারণা। নবম শতাব্দীতে আরব ও পারস্যের বণিক কাফেলার সাথে এই বন্দরনগরীতে যে সুফিদের আগমন ঘটেছিল, তাঁরা ছিলেন বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) প্রবর্তিত ‘তৈয়ফুরিয়া’ সিলসিলার অনুসারী। 

আমাদের গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ বলছে, বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) সশরীরে এ দেশে না এলেও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি একদল উচ্চমার্গের সুফি এই পাহাড়কে তাঁদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা দাওয়াতি মিশনের প্রধান আস্তানা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। পাহাড়ের চূড়ায় সারিবদ্ধ কবরের সারি মূলত সেই সব নাম-না-জানা ‘দাঈ’ ও সুফি সাধকদের নীরব সাক্ষ্য দেয়, যাঁরা ছিলেন বাস্তামী সিলসিলার অগ্রপথিক। তাঁদের দীর্ঘকালীন অবস্থান, নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত ও রূহানি মোজাহাদার কারণেই এই স্থানটি ওই সিলসিলার ইমামের নামে ‘মাকাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সুফি ঐতিহ্যে কোনো সিলসিলার কেন্দ্রকে সেই সিলসিলার প্রধানের নামে অভিহিত করার রীতি বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত, যা কেবল চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে অনন্য নয়। সুতরাং, বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) এই মাজারটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং এটি নবম শতাব্দীর সেই সুফি কাফেলার ত্যাগ, সাহসিকতা ও দাওয়াতি মিশনের এক অনন্য স্মারক। আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, তিনি সশরীরে না আসলেও তাঁর রূহানি ফয়েজ এবং তাঁর অনুসারীদের প্রাণের স্পন্দনে এই পাহাড় ধন্য হয়েছে। এই অসংখ্য কবর আমাদের সেই বার্তাই দেয় যে, এটি ছিল তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ এক আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বার।

সুলতানুল আরেফিন বায়েজিদ আল-বাস্তামী: জীবন, দর্শন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব

বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) ছিলেন সুফি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর পুরো নাম আবু ইয়াজিদ তৈয়ফুর বিন ঈসা বিন সুরূশান আল-বাস্তামী। তাঁর জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যায়, তিনি ৮০৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের (বর্তমান ইরান) কোমিস অঞ্চলের বাস্তাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশপরম্পরা বিশ্লেষণ করলে একটি আকর্ষণীয় রূপান্তর পরিলক্ষিত হয়; তাঁর পিতামহ সুরূশান ছিলেন একজন জরাথুস্ট্রবাদী বা অগ্নি উপাসক, যিনি পরবর্তী ইসলামের সুমহান আদর্শে দীক্ষিত হন। বায়েজিদ আল-বাস্তামীর পিতা ঈসা এবং তাঁর দুই চাচা আদম ও আলী-সকলেই ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার এবং দুনিয়া ত্যাগী সাধক। পারিবারিক এই পবিত্র পরিবেশ বায়েজিদের আধ্যাত্মিক সত্তাকে বিকাশিত করতে সাহায্য করেছিল। তিনি শৈশব থেকেই বৈষয়িক জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাঁর অধিকাংশ সময় কাটত ইবাদতখানা বা মসজিদে। বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) আধ্যাত্মিক দর্শন সুফিবাদের ইতিহাসে ‘সুক্র’ বা আধ্যাত্মিক মত্ততা হিসেবে পরিচিত। তাঁর পূর্ববর্তী সুফি সাধনা মূলত কঠোর সংযম ও ইবাদত-বন্দেগির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

কিন্তু বায়েজিদ আল-বাস্তামীই প্রথম ব্যক্তি যিনি ‘ঐশ্বরিক প্রেম’ বা ‘মুহাব্বত’-কে সুফি সাধনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি বা ‘শাতাহাত’  সুফি সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যেখানে তিনি নিজের নফস বা আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বে বিলীন হওয়ার কথা বলেছেন, যা সুফি পরিভাষায় ‘ফানা’ নামে পরিচিত। তিনি সুফিবাদের তৈয়ফুরিয়া ধারার প্রবর্তক, যা পরবর্তী প্রভাবশালী নক্সবন্দিয়া তরিকতের অন্যতম প্রধান উৎস ও পূর্বসূরি হিসেবে স্বীকৃত লাভ করে। দীর্ঘ আধ্যাত্মিক জীবন অতিবাহিত করার পর ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে এই মহান সাধক পরলোকগমন করেন। 

বায়েজিদ আল-বাস্তামীর প্রভাব কেবল পারস্যের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর শিক্ষা ও দর্শন সিল্ক রুটের বাণিজ্যিক কাফেলার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। যদিও তিনি সশরীরে সব জায়গায় যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর অনুসারীরা তাঁর নির্দেশিত পথে বিভিন্ন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেই সব স্থানে তাঁর স্মৃতি রক্ষা করার জন্য ‘মাকাম’ বা প্রতীকী মাজার নির্মাণ করেন। চট্টগ্রামের মাজারটি এই ধারারই একটি উজ্জ্বল প্রতিফলন। ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) তাঁর জীবনে প্রায় ৩০ বছর বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। তবে পারস্য বা তৎকালীন ভারতের কোনো নির্ভরযোগ্য দলিলে তাঁর বাংলাদেশ সফরের সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। এই ঐতিহাসিক শূন্যতা প্রমাণ করে যে, চট্টগ্রামের সাথে তাঁর সম্পর্কটি ‘শারীরিক’ ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি ‘আধ্যাত্মিক’ বা ‘রূহানি’ ছিল। তিনি সশরীরে না এলেও তাঁর প্রবর্তিত আদর্শ যে এই জনপদে কতটা প্রভাবশালী ছিল, চট্টগ্রামের এই ‘মাকাম’ তারই জীবন্ত সাক্ষ্য।

নবম শতাব্দীর চট্টগ্রাম: আরব্য বাণিজ্য ও সুফি কাফেলার পদার্পণ

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পাহাড়ের এই দরগাহের রহস্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে নবম শতাব্দীতে, যখন চট্টগ্রাম ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র । ঐতিহাসিক আল-ইদ্রিসি ১১৫৪ খ্রিস্টাব্দে উল্লেখ করেছিলেন যে, বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বসরা থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে যাতায়াত করত। এই জলপথের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক ও রূহানি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আরব বণিকেরা যখন তাঁদের বাণিজ্য তরী নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তেন, তাঁদের সাথে প্রায়ই থাকতেন ইসলামি ধর্মপ্রচারক এবং সুফি সাধকরা। তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার সুফিরা নবম শতাব্দীর শুরুর দিকেই এই অঞ্চলে পা রেখেছিলেন বলে জোরালো তথ্য পাওয়া যায়। 

চট্টগ্রাম বন্দর তখন কেবল পণ্য বিনিময়ের স্থান ছিল না, বরং তা ছিল আধ্যাত্মিক ভাব বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। চট্টগ্রামের পাহাড়ি ভৌগোলিক অবস্থা সুফি সাধকদের নির্জনবাস এবং ইবাদতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল ছিল। বিশেষ করে নাসিরাবাদের এই পাহাড়টি ছিল বনাঞ্চল বেষ্টিত ও শহর থেকে বিচ্ছিন্ন, যা একজন সুফি সাধকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করত। তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার প্রভাব এবং এই সিলসিলার অনুসারীদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা বায়েজিদ আল-বাস্তামীর ‘মুহাব্বত’ ও ‘ফানা’-র দর্শনকে বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিরা যে শান্তি ও মানবিকতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা স্থানীয় জনগণকে দ্রুত আকৃষ্ট করেছিল। 

গবেষকদের তাত্ত্বিক নিরূপণ অনুযায়ী, নবম শতাব্দীর সেই সুফি কাফেলা এই পাহাড়কেই তাঁদের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা ‘আস্তানা’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের ইবাদত, জিকির এবং রূহানি উপস্থিতির কারণেই কালক্রমে এই স্থানটি তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার প্রাণপুরুষ বায়েজিদ আল-বাস্তামীর নামে পরিচিতি পায়।

নাসিরাবাদ দরগাহের স্থাপত্য বিশ্লেষণ: মোঘল ও সুলতানি প্রভাবের সংমিশ্রণ

চট্টগ্রামের বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহ এলাকাটি কেবল একটি মাজার নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত স্থাপত্য কমপ্লেক্স। এটি মূলত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত: পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সমাধি ভবন, পাহাড়ের পাদদেশের প্রাচীন মসজিদ এবং সম্মুখভাগের বিশাল জলাশয় বা পুষ্করিণী। এই প্রতিটি স্থাপনার স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে আমরা এর প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাই।

মাজার কমপ্লেক্স ও এর বিবর্তন

পাহাড়ের ওপরের মাজারটি ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে পুনঃআবিষ্কৃত হওয়ার সময় এটি অত্যন্ত সাধারণ ও দেয়ালঘেরা অবস্থায় ছিল। বর্তমানে যে আধুনিক ইটের কাঠামো আমরা দেখি, তা বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের ফল। কিন্তু এর মূল ভিত্তিটি অত্যন্ত প্রাচীন। সুফি ঐতিহ্যে পাহাড়ের ওপর মাজার বা চিল্লাখানা নির্মাণের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে; এটি মূলত দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উঁচুতে আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট হওয়ার প্রতীক।

আওরঙ্গজেব মসজিদ: মোঘল স্থাপত্যের স্বাক্ষর

মাজারের পাদদেশে অবস্থিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম স্থাপত্য। এটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের (১৬৫৮-১৭০৭) শাসনকালে নির্মিত বলে বিশ্বাস করা হয়। মসজিদের স্থাপত্যশৈলীতে মোঘল রীতির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতি মিনার বা টারেট রয়েছে, যা কুঁড়ি আকৃতির কাপোলা দ্বারা সুশোভিত। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি পাশের দুইটির চেয়ে আকারে কিছুটা বড়, যা মোঘল স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মসজিদের ভেতরের মিহরাব ও কিবলা দেয়াল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ। এই মসজিদটি প্রমাণ করে যে, অন্তত ১৭০০ শতাব্দীতেও এই স্থানটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছিল। 

বায়েজিদ আল-বাস্তামী মাজার কমপ্লেক্সের স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই কমপ্লেক্সের প্রধান অংশ মাজার ভবনটি আধুনিক ইটের কাঠামোয় তৈরি হলেও এটি মূলত নবম শতাব্দীর প্রাচীন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা পরবর্তী ১৯০০ শতাব্দীতে সংস্কার করা হয়। মাজারের পাশেই রয়েছে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে (১৭০০ শতাব্দী) নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি চমৎকার মসজিদ, যাতে মোঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে অষ্টভুজাকৃতি টারেট লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া কমপ্লেক্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়েছে একটি বিশাল জলাশয় বা মাজার পুকুর, যা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক পানির উৎস হিসেবে বিদ্যমান। এই স্থাপত্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নাসিরাবাদের এই পাহাড়টি যুগের পর যুগ ধরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে ছিল। সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোঘল আমল পর্যন্ত এই স্থানটির সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রমাণ করে।

‘মাকাম’ ও ‘জওয়াব’ তত্ত্ব: ঐতিহাসিক সত্যের ভারসাম্যপূর্ণ নিরূপণ

চট্টগ্রামের বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক রহস্য হলো এর সমাধি। যদি তিনি ইরানে শায়িত থাকেন, তবে চট্টগ্রামে তাঁর মাজার কেন? সুফি শাস্ত্রের গভীরতর আলোচনায় এর দুটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়: ‘মাকাম’ ও ‘জওয়াব’। গবেষকদের তাত্ত্বিক নিরূপণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইসলামের ইতিহাসে যে সমস্ত সুফি বা দাঈ আরব বা পারস্য থেকে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে হিজরত করেছেন, তাঁরা সাধারণত নিজ দেশে আর ফিরে যাননি। নবীজির (সা.) ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরামদের মক্কা-মদীনা ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ও সেখানেই সমাহিত হওয়া এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। চট্টগ্রামের এই দরগাহের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) যদি সশরীরে চট্টগ্রামে আসতেন, তবে সুফি ঐতিহ্যের এই ঐতিহাসিক ধারা অনুযায়ী তাঁর মাজার এখানেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেহেতু তাঁর প্রধান সমাধি ইরানে সুসংরক্ষিত, তাই এটি নিশ্চিত হয় যে নাসিরাবাদ পাহাড়ের চূড়ায় শায়িত সারিবদ্ধ নামহীন কবরগুলো আসলে সেই সব ত্যাগী ‘দাঈ’ ও অনুসারীদের, যাঁরা হিজরত করে এ দেশে এসেছিলেন ও পীরের আদর্শ প্রচারে জীবন উৎসর্গ করে এখানেই থেকে গেছেন।

মাকাম বা চিল্লাখানা হিসেবে দরগাহ

সুফি পরিভাষায় ‘মাকাম’ বলতে এমন একটি স্থানকে বোঝায় যেখানে কোনো মহান অলি বা সাধক দীর্ঘকাল অবস্থান করে ইবাদত করেছেন অথবা যে স্থানে তাঁর রূহানি ফয়েজ প্রবলভাবে অনুভূত হয়। বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) সশরীরে এখানে না আসলেও তাঁর তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার উচ্চমার্গের অনুসারীরা যখন এখানে এসে ইবাদত শুরু করেন, তখন তাঁরা তাঁদের ইমামের রূহানি উপস্থিতিকে আহ্বান করতেন। তাঁদের সম্মিলিত রূহানি সাধনার মাধ্যমে এই স্থানটি বায়েজিদ আল-বাস্তামীর একটি আধ্যাত্মিক ‘অংশ’ বা ‘মাকাম’-এ পরিণত হয় । সুফিদের মতে, একজন কামেল পীরের রূহানি সত্তা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি তাঁর মুরিদ বা অনুসারীদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর ‘নুর’ বা রূহানি উপস্থিতি প্রবাহিত করতে পারেন।

‘জওয়াব’ বা প্রতীকী সমাধির ধারণা

ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খান এবং অন্যান্য গবেষকরা মনে করেন, এই সমাধিটি একটি ‘জওয়াব’ বা অনুকরণীয় মাজার। এটি মূলত ভক্তদের ভক্তি ও ভালোবাসার এক প্রতীক। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বিখ্যাত সুফির নামে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রতীকী মাজার পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে এই মাজারের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে এর প্রাচীনত্বের মধ্যে। নবম শতাব্দীতে যখন তৈয়ফুরিয়া সিলসিলা এখানে আসে, তখন থেকেই এই পাহাড়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮০০ শতাব্দীর অনেক বাঙালি কবি ও সাহিত্যিক তাদের কাব্যগ্রন্থে ‘নাসিরাবাদের শাহ সুলতান’-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। 

গবেষকদের মতে, ‘শাহ সুলতান’ নামটি বায়েজিদ আল-বাস্তামীর উপাধি ‘সুলতানুল আরেফিন’-এরই একটি আঞ্চলিক সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, স্থানীয় জনগণের হৃদয়ে বায়েজিদ আল-বাস্তামীর প্রভাব কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই অত্যন্ত গভীর ছিল।

বাস্তামী কচ্ছপ: কিংবদন্তি বনাম বিপন্ন প্রাণিবিদ্যার রহস্য

চট্টগ্রামের বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহের কথা আলোচনা করলে যে জিনিসটি সবার আগে মানুষের মনে ভেসে ওঠে, তা হলো মাজারের পুকুরে বসবাসকারী শত শত বিশালকায় কচ্ছপ। এই কচ্ছপগুলো কেবল এই পুকুরেই দেখা যায় বলে একসময় দীর্ঘ বিশ্বাস ছিল, যা এর আধ্যাত্মিক রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।

আধ্যাত্মিক কিংবদন্তি ও জিনের রূপান্তর

স্থানীয় লোককথা ও কিংবদন্তি অনুযায়ী, এই কচ্ছপগুলো মূলত অশুভ জিন বা প্রেতাত্মা ছিল; যারা বায়েজিদ আল-বাস্তামীর অবাধ্য হয়েছিল। সাধক রাগান্বিত হয়ে তাদের অভিশাপ দিয়ে কচ্ছপে রূপান্তরিত করেন ও আজীবন এই পুকুরে অবস্থান করে আগত ভক্তদের সেবা করার বা তাঁদের কাছ থেকে খাবার গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই কিংবদন্তিটি সুফি দর্শনের সেই দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে যেখানে মানুষের নফস বা রিপুকে বশীভূত করার ক্ষমতা আধ্যাত্মিক সাধকের থাকে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই কচ্ছপগুলোকে খাবার দেওয়া বা তাদের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত পুণ্যের কাজ এবং এর মাধ্যমে মানত পূরণ হয়।

বৈজ্ঞানিক সত্য: ‘ব্ল্যাক সফট-শেল টার্টল’

প্রাণিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই কচ্ছপগুলো এক পরম বিস্ময়। এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে ‘নিলসোনিয়া নিগ্রিকান্স’ নামে পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে, এই প্রজাতিটি বন্য পরিবেশে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এবং কেবল চট্টগ্রামের এই মাজারের পুকুরেই এদের অস্তিত্ব টিঁকে আছে। ২০০২ সালে আইইউসিএন এই কচ্ছপগুলোকে ‘প্রকৃতিতে বিলুপ্ত’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে আধুনিক ডিএনএ বিশ্লেষণ ও পরবর্তী গবেষণায় ভারত ও নেপালের কিছু মন্দির সংলগ্ন পুকুরেও এই প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের এই পুকুরটিই তাদের সবচেয়ে প্রাচীন এবং নিরবচ্ছিন্ন আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত। 

বাস্তামী কাছিমের বৈজ্ঞানিক বিবরণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো হলো বৈজ্ঞানিকভাবে ‘নিলসোনিয়া নিগ্রিকান্স’ (পূর্বে যা অ্যাসপিডেরেটিস নিগ্রিকান্স নামে পরিচিত ছিল) নামে পরিচিত এই বিরল প্রজাতির কাছিমটি স্থানীয়ভাবে বোস্তামি কাছিম, মাজারি বা গদালী-মদালী নামে পরিচিত। এদের প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে নরম কালো খোলস এবং পানির নিচে শ্বাস নেওয়ার উপযোগী নলের মতো থুতনি বা স্নরকেল। সাঁতার কাটার জন্য এদের পাগুলো শক্তিশালী প্যাডেলের মতো হয়ে থাকে। আইইউসিএন রেড লিস্ট অনুযায়ী এই প্রজাতিটি বর্তমানে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। 

স্থানীয় জনশ্রুতি ও বিশ্বাস মতে, এই প্রজাতিটি অত্যন্ত দীর্ঘজীবী এবং এদের গড় আয়ু আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই কচ্ছপগুলো মূলত গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় বিচরণ করত। কোনো এক প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে তারা এই পুকুরের মতো সংরক্ষিত পরিবেশে আটকা পড়ে যায় । দরগাহের এই পুকুরটি তাদের জন্য একটি জিন ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে, যা একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিকে সহস্রাব্দ ধরে টিঁকিয়ে রেখেছে।

চট্টগ্রামের ‘বার আউলিয়া’ ও আধ্যাত্মিক মানচিত্রে বায়েজিদ আল-বাস্তামীর স্থান

চট্টগ্রামকে ঐতিহাসিকভাবে ‘বার আউলিয়ার দেশ’ বা ‘বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি’ বলা হয় । এই অঞ্চলের প্রতিটি পাহাড় এবং বাঁকে কোনো না কোনো সাধকের স্মৃতি মিশে আছে। বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহ এই আধ্যাত্মিক মানচিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল বিন্দুগুলোর একটি।

বার আউলিয়ার জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চট্টগ্রামের নামকরণের সাথেও সুফি ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বলা হয়, হযরত বদর শাহ (রহ.) চেরাঘ বা প্রদীপ জ্বালিয়ে অশুভ শক্তিকে তাড়িয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন, যা থেকে ‘চাটগাঁ’ বা ‘চাটি-গাঁ’ নামের উৎপত্তি। এই বার আউলিয়ার তালিকায় বায়েজিদ আল-বাস্তামীকে (রহ.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখা হয়। যদিও ঐতিহাসিক কালক্রম অনুযায়ী বদর শাহ, শাহ আমানত বা অন্যান্য পীররা বিভিন্ন সময়ে এসেছেন, কিন্তু বায়েজিদ আল-বাস্তামীর নাম নবম শতাব্দীর সেই আদি সুফি চেতনার স্মারক হিসেবে বিবেচিত হয়। চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আউলিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.), যার দরগাহ নাসিরাবাদ পাহাড়ে অবস্থিত এবং এটি মূলত নবম শতাব্দীর তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার একটি প্রতীকী মাকাম হিসেবে বিবেচিত। চট্টগ্রামের প্রাচীনতম ইসলাম প্রচারকদের মধ্যে হযরত বদর শাহ (বদর পীর) অনন্য, যার মাজার বক্সিরহাটের বদরপটিতে অবস্থিত এবং তিনি ১৪০০ শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। ১৮০০ শতাব্দীর প্রভাবশালী সাধক হযরত শাহ আমানত (রহ.) লালদীঘি সংলগ্ন মাজার থেকে চট্টগ্রামের অন্যতম আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে সমাদৃত। এছাড়া নাসিরাবাদের ষোলশহর এলাকায় অবস্থিত হযরত শেখ ফরিদের (রহ.) দরগাহটি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ‘চশমা-ই-হযরত শেখ ফরিদ’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত।

এই আউলিয়াদের মাধ্যমেই চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে ‘বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। এই সুফি সাধকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলটি এমন একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভক্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একাকার হয়ে গেছে। বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন, যাঁদের মধ্যে কেবল মুসলমান নন, বরং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই সর্বজনীনতা সুফিবাদের সেই চিরন্তন সত্যকে মনে করিয়ে দেয়, যা জাত-পাত ও ধর্মের উর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়।

তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার বিবর্তন ও ভারতীয় উপমহাদেশে এর বিস্তার

বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) প্রবর্তিত তৈয়ফুরিয়া ধারাটি সরাসরি কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলায় আসেনি, বরং এটি বিভিন্ন উপ-শাখা ও মিশ্র রীতির মাধ্যমে প্রবেশ করেছে। তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায় নকশবন্দিয়া সিলসিলার ওপর। বলা হয়, নকশবন্দিয়া সিলসিলার জিকির এবং সাধনার অনেক অংশ তৈয়ফুরিয়া দর্শন থেকে ধার নেওয়া হয়েছে। ভারতে তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার উপস্থিতি অত্যন্ত প্রাচীন। 

কিছু ঐতিহাসিক তথ্যমতে, বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ বদিউদ্দিন জিন্দা শাহ মাদার (রহ.) তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি বায়েজিদ আল-বাস্তামীর রূহানি নির্দেশে ভারতের মাকানপুরকে তাঁর সাধনার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একই তত্ত্ব প্রযোজ্য। নবম শতাব্দীতে যে সুফি কাফেলা চট্টগ্রামে এসেছিল, তাঁরা সম্ভবত মাকানপুর বা অন্যান্য তৈয়ফুরিয়া কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তাঁরা বায়েজিদ আল-বাস্তামীর ‘সুক্র’ বা আধ্যাত্মিক মত্ততার পথ অনুসরণ করে চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে আস্তানা গেড়েছিলেন। তাত্ত্বিক নিরূপণ অনুযায়ী, এসব সাধকরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পছন্দ করতেন এবং নিজেদের পীরের নামে আস্তানাগুলোকে উৎসর্গ করতেন। নাসিরাবাদ পাহাড়ের চূড়ার কবরের সারি মূলত সেসব উৎসর্গীকৃত প্রাণের সাক্ষ্য দেয়। তাঁরা ছিলেন এমন এক সৈনিক, যাঁরা সশরীরে বায়েজিদ আল-বাস্তামীকে না দেখলেও তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই দূরবর্তী ভূখণ্ডে এসেছিলেন।

সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: বিশ্বাস বনাম যুক্তির দোলাচল

চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহ কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়ের এক অন্যতম কেন্দ্র। এই দরগাহের সাথে মানুষের যে আবেগীয় সম্পর্ক, তা সমাজতাত্ত্বিক বিচারে অত্যন্ত গভীর।

‘গোপন ঐতিহ্য’ ও লোকজ বিশ্বাস

আধুনিক নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মাজারগুলোকে ‘গোপন ঐতিহ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানকার দর্শনার্থীরা মনে করেন যে, সুফি সাধকরা তাঁদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারেন ও আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে পারেন। নাসিরাবাদের এই দরগাহে মানত করা, শিরনি দেওয়া এবং কচ্ছপকে খাবার খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ তাঁদের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পান। এটি মূলত বাংলার লোকজ ইসলামের একটি বহিঃপ্রকাশ, যা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।

ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের অপবাদ থেকে মুক্তি

এই দরগাহকে ঘিরে অনেক সময় ‘কুসংস্কার’-এর অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক নিরূপণ করলে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঐতিহাসিক ভিত্তি। বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) আগমনকে যখন আমরা ‘শারীরিক’ না বলে ‘আদর্শিক’ ও ‘রূহানি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করি, তখন এটি আর নিছক কুসংস্কার থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি মহান ঐতিহ্যের প্রতি উত্তরসূরিদের সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। সুফি ঐতিহ্যে ‘মোরাকাবা’ বা ধ্যানের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে যখন আমরা আধুনিক ‘গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ’-এর ছাঁচে ফেলি, তখন এর যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি বায়েজিদ আল-বাস্তামীর প্রতি মানুষের ভক্তিকেও অক্ষুণ্ন রাখে এবং ইতিহাসের সত্যকেও সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করে।

দরগাহের আধুনিক চ্যালেঞ্জ: পরিবেশগত ভারসাম্য ও সংরক্ষণ সংকট

বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহ বর্তমানে কিছু আধুনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যা এর ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশেষ করে পুকুরের কচ্ছপগুলোর স্বাস্থ্য এবং মাজারের পরিবেশ রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

পরিবেশগত দূষণ ও কচ্ছপদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

মাজারে আসা হাজার হাজার ভক্ত প্রতিদিন কচ্ছপগুলোকে খাবার দেন। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, এই খাবারের মান অত্যন্ত নিম্ন এবং কচ্ছপদের প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাসের পরিপন্থী। অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার কচ্ছপদের পুষ্টিহীনতা ও লিভারের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া পুকুরে অতিরিক্ত ময়লা ফেলার কারণে পানির অক্সিজেন লেভেল কমে যাচ্ছে, যা এই মহাবিপন্ন প্রাণীগুলোর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ২০০৬ সালের বিষপ্রয়োগের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, সেজন্য মাজার কমিটিকে আরও সচেতন হতে হবে ।

প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও আইনি লড়াই

দরগাহের পরিবেশ ও পুকুর রক্ষায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০১২ সালে পুকুরের একটি অংশ ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে আদালত তা বন্ধ করে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে এর মর্যাদা রক্ষা করা এবং প্রাচীন মোঘল মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অবিকৃত রাখা বর্তমান প্রজন্মের একটি গুরুদায়িত্ব।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও ভাষাগত রূপান্তর

চট্টগ্রামের দরগাহগুলোর প্রভাব কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্রে নয়, বরং এই অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও গভীরভাবে পড়েছে। বায়েজিদ আল-বাস্তামী দরগাহের মতো আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো আরব ও পারস্যের সাথে চট্টগ্রামের যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করেছিল, তার ছাপ আজও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় স্পষ্ট। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ডায়লেক্টে প্রায় ৫০ শতাংশ শব্দই আরবি ও ফারসি উৎস থেকে এসেছে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল সেই সব সুফি সাধক ও আরব বণিকদের দীর্ঘকালীন অবস্থানের ফল; যাঁরা নাসিরাবাদের মতো পাহাড়গুলোতে আস্তানা তৈরি করেছিলেন। তৈয়ফুরিয়া সিলসিলার সুফিরা যখন এখান থেকে দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করতেন, তখন তাঁরা স্থানীয় জনগণের সাথে এমন এক মৈত্রীর বন্ধন তৈরি করেছিলেন যে তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতি স্থানীয় জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল।চট্টগ্রামকে ‘পর্তুগিজদের পোর্তো গ্রান্দে’ বলার অনেক আগে থেকেই এটি ছিল ‘ইসলামের প্রবেশদ্বার’ বা ‘বাব-উল-ইসলাম’। সুলতানুল আরেফিনের নামে উৎসর্গীকৃত এই মাজারটি সেই প্রাচীন সম্পর্কের এক জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

উপসংহার: রূহানি ফয়েজ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মেলবন্ধন

বলা যায়, মক্কা-মদীনার বাইরে হিজরত করে দ্বীন প্রচারকারী সাহাবায়ে কেরামদের যে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, বায়েজিদ আল-বাস্তামীর অনুসারীরা সেই একই আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামের দাওয়াত কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। চট্টগ্রামের বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) দরগাহ কেবল একটি স্থাপনা বা নিছক কিছু জনশ্রুতির সমষ্টি নয়। এটি একটি সুদীর্ঘ রূহানি পরম্পরার স্মারক। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে আমরা যখন দেখি যে. বায়েজিদ আল-বাস্তামী সশরীরে ইরানে শায়িত, তখন আমাদের ভক্তি হোঁচট খায় না; বরং তা আরও প্রসারিত হয় এই উপলব্ধিতে যে-একজন মানুষের আদর্শ কতটা শক্তিশালী হলে হাজার মাইল দূরে অন্য এক ভূখণ্ডের মানুষ তাঁর নামে মাজার তৈরি করে দীর্ঘ ১ হাজার বছর ধরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারে। আমাদের তাত্ত্বিক নিরূপণ ও গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ এটাই বলে যে, নবম শতাব্দীর সেই তৈয়ফুরিয়া সুফি কাফেলা এই পাহাড়কে যে রূহানি শক্তিতে ধন্য করেছিলেন, তা আজও নাসিরাবাদের বাতাসে অনুভূত হয়। 

পাহাড়ের চূড়ার নামহীন কবরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রচারের পাদপ্রদীপের নিচে না থেকেও কীভাবে একটি দর্শনকে অমর করে রাখা যায়। বায়েজিদ আল-বাস্তামীর (রহ.) এই দরগাহটি মূলত মিথ ও বাস্তবতার এমন এক মিলনস্থল, যেখানে ইতিহাসের শুষ্ক তথ্য সুফিবাদের শীতল প্রেমে এসে সিক্ত হয়েছে। এই মাজারটি চট্টগ্রামের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বার হওয়ার দাবি রাখে। কারণ এটি কেবল একটি ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সুফি সিলসিলার সাথে বাংলার নাড়ির সম্পর্কের এক অবিনশ্বর দলিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই দরগাহের বার্তা হবে-ভক্তি ও যুক্তির সমন্বয়েই সত্যকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বায়েজিদ আল-বাস্তামী (রহ.) সশরীরে না এসেও তাঁর রূহানি উত্তরাধিকার ও অনুসারীদের মাধ্যমে বাংলার এই পবিত্র ভূমিকে যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা ইতিহাসের এক অমূল্য রত্ন হয়ে চিরকাল দেদীপ্যমান থাকবে। নাসিরাবাদ পাহাড়ের প্রতিটি ধূলিকণা এবং পুকুরের প্রতিটি প্রাণীর সাথে মিশে আছে সেই সহস্রাব্দের পুরনো রূহানি স্পন্দন, যা আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে ‘সুলতানুল আরেফিন’-এর উপস্থিতি জানান দেয়।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চট্টগ্রাম   বায়েজিদ আল-বাস্তামী   দরগাহ   মিথ   বাস্তবতার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close