সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ভয়াবহ নৌকাডুবিতে ২৫০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নিখোঁজের ঘটনায় মানবপাচার চক্র নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দারিদ্র্য ও নির্যাতনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা এবং পাচারকারীদের ভূমিকা নিয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। জীবন বাঁচানোর আশায় ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়া মানুষদের দুর্দশা আর সেই সুযোগে গড়ে ওঠা অবৈধ নেটওয়ার্ক, সব মিলিয়ে করুণ এক চিত্র।
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধ নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা নয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসছে বহুস্তর বিশিষ্ট মানবপাচার চক্রের হদিস। এই চক্র রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে আছে। শুধু মালয়েশিয়াই নয় ইউরোপ অভিমুখে সমুদ্রপথে অভিবাসন প্রত্যাশীদের তালিকায় বাংলাদেশের শীর্ষে। আর এই শীর্ষে থাকার বিষয়টি এটিই নির্দেশ করে যে, আমরা আমাদের জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ তথা যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি।
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ২০,২৫৯ জন বাংলাদেশি অবৈধপথে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছেন। এটি সমুদ্রপথে পৌঁছানো মোট অভিবাসীর ৩০.৫ শতাংশ, যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপমুখী হচ্ছেন যা আমাদের তরুণ প্রজন্মের এক বড় অংশের মধ্যে বিরাজমান গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের চিত্রটিই ফুটিয়ে তোলে।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশ থেকে এই অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে; চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ১,৩৫৮ জন বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন। তার চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। গত মার্চ মাসেই লিবিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে একটি ছোট নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ২১ জন বাংলাদেশি, যারা গ্রিসের উপকূলে রক্ষা পেয়েছেন, তারা পরবর্তীতে পাচারকারীদের অমানবিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান।
তাদের অনেককে মাসের পর মাস তথাকথিত ‘গেম ঘরে’ বা বন্দিশালায় ফোন ও নথি ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছিল; এমনকি পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয়টুকুও দেওয়া হয়নি। অবশেষে ছোট ছোট রাবার বোটে করে তাদের সমুদ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রায়ই এই অভিবাসন প্রত্যাশীরা টহল জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধার হন, কিন্তু তাতে তাদের দুর্ভোগ শেষ হয় না। অনেকে রিক্ত হস্তে এবং বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে দেশে ফেরেন। পাচারকারীরা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি করে রাখে এবং অমানবিক নির্যাতনের পর ছোট রাবার বোটে উত্তাল সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়।
সিআইডি-র তথ্যমতে, গত এক দশকে মূলত ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্রায় ৭০ হাজার মানুষ এই মরণফাঁদে পা দিয়েছেন। এর সঙ্গে বাঙালি, রোহিঙ্গাসহ একটি বিশাল নেটওয়ার্ক যুক্ত। যেহেতু অনিয়মিত অভিবাসনের খবরগুলো তরুণদের এই বিপজ্জনক যাত্রা থেকে বিরত রাখতে পারছে না, তাই সরকারের উচিত মানবপাচার প্রবণ এলাকাগুলোতে আরও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা। তরুণদের দক্ষ অভিবাসনের জন্য প্রশিক্ষিত করা যেতে পারে অথবা তাদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
তথাকথিত ‘ইউরোপীয় স্বপ্নের’ পেছনে দৌড়ে এ দেশের তরুণদের জীবন ও স্বপ্ন যেন অকালে হারিয়ে না যায়, তা সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে যত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় ততই মঙ্গল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একসঙ্গে গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে সুফল আসবে বলে আশা করা যায়। বৈধপথে সরকার অনুমোদিত দেশগুলোয় শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সহানুভূতিশীল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানব পাচারকারী দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে, অন্যদিকে সরকারি সহায়তায় গ্রামীণ অঞ্চলের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষদের আত্মনির্ভরশীল করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কেকে/ এমএস