মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
হামে মৃত্যু : দায়, দায়িত্ব ও দোষারপ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২৮ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

২১ এপ্রিল মঙ্গলবার পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ২৫৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হঠাৎ করে হামে এত মৃত্যুর দায় কার? যেখান পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ থেকেই বিদায় নিয়েছে হাম সেখানে বাংলাদেশে কি এমন ঘটেছে যে আড়াইশ ও বেশি শিশুর প্রাণ দিতে হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাম শুধু বাংলাদেশেই না, বরং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোতেও আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। 

কিন্তু কেন? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। 

ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকার ঘাটতির কারণে হাম প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি তৈরি হলেও উন্নত বিশ্ব কিংবা বিশ্বজুড়ে নানা দেশে হামে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে কেন? এর একটি বড় কারণ কোভিড মহামারি। ওই সময়ে সারাবিশ্বেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও বেড়েছে, যা হাম সংক্রমণ ফিরে আসার পথ তৈরি করেছে। অনেকেই তখন টিকাদান থেকে বিরত ছিলেন।

ভারতের বিশাল জনপদে হামের আক্রমণ বর্তমানে স্তিমিত হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো সংক্রমণ বিদ্যমান। সর্বশেষ তথ্যমতে, পুরো ভারতবর্ষে আক্রান্তের সংখ্যা সহস্রাধিক হলেও মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে তারা। পাকিস্তানে অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতায় হাম পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। সেখানে সংক্রমণের মাত্রা বাংলাদেশের চেয়ে কম হলেও মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক ডজন ছাড়িয়েছে।

নেপালে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হতে চললেও বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে কার্যকর টিকা কর্মসূচির কারণে সেখানে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি।

শ্রীলঙ্কা, ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল দেশ হিসেবে হাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। শক্তিশালী টিকাদান কাঠামোর কারণে সেখানে মৃত্যুর পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে। আফগানিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় টিকা কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। সংক্রমণ থাকলেও মহামারি আকার ধারণ করেনি। বাংলাদেশে হামের তীব্রতার নেপথ্যে কি রয়েছে? 

করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের যে কদর্য রূপ প্রকাশ পেয়েছিল, বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব তাকে আরও একবার জনসম্মুক্ষে নিয়ে এসেছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামোকে ভেতর থেকে যে কতটা ফোকলা করে দিয়েছিল, আজ শত শত শিশুর মৃত্যু তারই প্রমাণ। তবে জনস্বাস্থ্যের এই গভীর সংকট এখন রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক দোষারোপের ইস্যুতে। 

গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান বিএনপি সরকারের শুরুতেই হামের এই প্রাদুর্ভাব একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে সমাধানের চেয়ে অন্যের ওপর দায় চাপানোর পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাও লক্ষ করা যাচ্ছে। 

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দাবি করেছেন, বিগত আট বছর কোনো সরকারই হামের টিকা দেয়নি। অথচ এই বক্তব্য নাগরিক সমাজে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক অভিভাবক তাদের শিশুর টিকা কার্ডের ছবি প্রকাশ করে মন্ত্রীর তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংক্রামক রোগের মহামারির সময় তথ্যের স্বচ্ছতা যেখানে সবচেয়ে জরুরি, সেখানে নীতি-নির্ধারকদের এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমনে আতঙ্ক ও অবিশ্বাস তৈরি করছে।

বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্য খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকটের মূলে রয়েছে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘকালীন অবহেলা এবং এর পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার ব্যর্থতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী সরকারের আমলে স্বাস্থ্যখাতে যে বিশাল বাজেটের দুর্নীতি ও টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, সেখানে সংস্কার আনতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। 

১৯৯৮ সাল থেকে দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তায় চলা ‘হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম’ (এইচএনপিএসপি)-এর চতুর্থ ধাপ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হলেও আওয়ামী সরকার পরবর্তী ধাপের অনুমোদন দেয়নি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোটি বাতিল করে নিজস্ব অর্থায়নে ছোট মেয়াদি কর্মসূচি হাতে নেয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় ও পরিকল্পনার অভাবে টিকা কেনার প্রক্রিয়া থমকে যায়। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরের পর আর কোনো বরাদ্দ রিলিজ না হওয়ায় কেন্দ্রীয় গুদামে হামসহ ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমে আসে। এই ‘ট্রানজিশনাল গ্যাপ’ বা অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতাই বর্তমান মহামারির প্রধান কারিগর। 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে টিকাদান একটি রাষ্ট্রের ‘কোর অবলিগেশন’ বা বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। টিকা সরবরাহে এই বিলম্ব সরাসরি মানুষের ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ বা রাইট টু লাইফের ওপর আঘাত।

হামের এই প্রাদুর্ভাব কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতাও বটে। করোনা মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা একটি বিশাল ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় হাজার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। 

এর পেছনে কাজ করছে আমাদের ভঙ্গুর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই, মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য ও জনবল নেই এবং সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। ইপিআই কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এখন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। এটি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন এক চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার পেছনে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অসন্তোষও বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সাল থেকে বিভিন্ন সময় বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে স্বাস্থ্য সহকারীরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে টানা দুই সপ্তাহের কর্মবিরতিতে সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র বন্ধ ছিল। ফলে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ মা ও শিশু নিয়মিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই প্রশাসনিক স্থবিরতা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ে বারবার রদবদল পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে।

পরিশেষে বলতে হয়, টিকা সংকটের কারণে আজ যে হাজার হাজার শিশু ঝুঁকির মুখে এবং শত শত প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে, তার দায়ভার রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। সংস্কারের নামে দীর্ঘদিনের সফল একটি কাঠামোকে হুট করে অকার্যকর করা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক অপরাধ। জনস্বাস্থ্যের এই বিপর্যয়কে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার না করে এখন জরুরি ভিত্তিতে টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং টিকাদান কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। 

আমরা চাই না, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবহেলা ও অযোগ্যতার বলি হয়ে আর কোনো শিশুর জীবন হুমকির মুখে পড়ুক। স্বাস্থ্যখাতে আমূল সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তদন্তের মাধ্যমে এই সংকটের নেপথ্যে থাকা দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এমন বিপর্যয় থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনগণের সচেতনতাই পারে এই তপ্ত মরুভূমিতে প্রশান্তির বৃষ্টি নামাতে। আমাদের প্রতিটি শিশুর হাসি যেন আবারও ফিরে আসে, সেই প্রার্থনায়..

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close