জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় আসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সংগঠনটির একচেটিয়া জয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
তবে আলোচনায় থাকলেও এখনো দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে না এসে পরিচয় গোপন রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি ঘোষণা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আংশিক। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নামমাত্র কয়েকজন নেতাকর্মী প্রকাশ্যে এলেও অপ্রকাশ্য কাজ করছে সংগঠনটির হল শাখা কমিটি। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকে আবার এটিকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার পেছনে নেপথ্যে ভূমিকা ছিল শিবিরের। একদিকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও অন্যদিকে তারাই গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে বাস্তবায়ন করছে রাজনৈতিক এজেন্ডা।
এদিকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা হলে সংগঠনটির একাধিক কর্মী জানান, ছাত্রশিবির একটি সক্রিয় ছাত্রসংগঠন। ফ্যাসিবাদী আমলে তাদের প্রতি নানাবিধ জুলুম, নির্যাতনের ফলে এক পর্যায়ে তারা নিজেদের কিছুট আড়াল করার প্রবণতা শুরু করে। অর্থাৎ সাংগঠনিক পদ-পদবি প্রকাশ না করেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও সেই রেষ দেখা যায়, ছাত্র সংগঠনটি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিলেও অনেক পরিচিত মুখের রাজনৈতিক পদ-পদবির পরিচয় জানত না সাধারণ মানুষ। জুলাই পরবর্তীতে তাদের অনেক ছাত্রনেতার পদ-পদবি সামনে আসে। যা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকে বিস্মিত করে। কারণ জুলাই পূর্বে যাদের সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে, জুলাই পরবর্তীতে দেখা যায় তারা একেকজন শিবিরের পদধারী নেতা। যার ফলে বিরোধী ছাত্রসংগঠনের অনেকেই এটিকে গুপ্ত বলে প্রচার করে।
এ ছাড়া আভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের সীমিত প্রকাশ। সভা, প্রশিক্ষণ বা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে আসে না। কমিটির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন ছাড়া বিভিন্ন শাখা, উপশাখার সবার পরিচয় পাবলিকলি প্রকাশ করা হয় না।
তাদের দাবি এটি যেহেতু ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠন যেখানে নিবিড় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ থাকে, যা বাইরে থেকে কম দৃশ্যমান ফলে সমালোচকরা বিষয়টিকে গুপ্ত কার্যক্রম হিসেবে অভিহিত করেন। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যও অনেক সময় গুপ্ত শব্দটির অযাচিতভাবে ব্যবহার করা হয় বলেও জানান তারা।
তথ্যমতে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক হলগুলোতে আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি না থাকলেও সক্রিয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। নির্দিষ্ট কোনো হল কমিটি বা প্রকাশ্য সাংগঠনিক কাঠামো না থাকলেও শাখা শিবিরের কর্মী বা সদস্য পরিচয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা।
এর আগে ১২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির তাদের ফেসবুক পেজে ১৮ জনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করলেও হলগুলোতে কোনো কমিটি দেয়নি। যার ফলে গুপ্ত রাজনীতি চর্চা নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
হল কমিটি না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ও জাকসু জিএস মাজহারুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, ‘বিগত ছাত্ররাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার দরুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতি চলার ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা এখনো ইতিবাচক না। শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই আমরা হল কমিটি ফাংশন করিনি। তবে স্বাভাবিকভাবে হলগুলোতে আমাদের যে জনশক্তি বা কর্মী-সদস্য আছেন, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জায়গা থেকে ছাত্রশিবিরের দাওয়াতি কাজগুলো করে যায়। এর বাইরে হল কমিটি হিসাবে যে কার্যক্রমগুলো; সে কার্যক্রমগুলো হলে দৃশ্যমান নয়।’
ভবিষ্যতে হল কমিটি আসবে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে হলগুলোতে ছাত্রশিবির তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে বা ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে ইতিবাচক হয় তবে সেক্ষেত্রে আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী হলগুলোতে পুরোদমে কার্যক্রম পরিচালনা করার।
রাবিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ না করার রাজনীতি প্রসঙ্গে সংগঠনটির প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক খোলা কাগজকে মেহেদী সজীব বলেন, রাবি শিবির বর্তমানে সরাসরি রাজনৈতিক সভার চেয়ে সামাজিক ও সেবামূলক কাজের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শতাধিক সদস্যের কমিটি দিয়েও তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। আমরা বিশাল কমিটি না দিয়ে ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনতে চাচ্ছি। আমরা আমাদের ভুলত্রুটি থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিচ্ছি এবং দলটিকে আরও আপডেট করছি। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা নিয়ে আমরা ভাবছি।
উল্লেখ্য, ‘গুপ্ত’ লেখাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার সকালে একদফা সংঘর্ষের পর বিকেলে আবারও সংঘর্ষে জড়ায় দুটি পক্ষ। এ বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় ছাত্রদল ও শিবির নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন ‘যদি শিবিরকে একবার গুপ্ত বলার কারণে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে আপনারা একবার হামলা করেন, তাহলে আগামী কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজারবার, প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি লেখনীতে আমরা আপনাদের গুপ্ত বলেই ডাকব।’ গতকাল বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট মোড়ে সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম বলেছেন দেওয়ালে যে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে, সেই শব্দটি প্রধানমন্ত্রী চয়ন করেছেন, যা তার পদের সঙ্গে যায় না। তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আর কোনো ট্যাগিং বা গণরুম সংস্কৃতির রাজনীতি ফিরে আসুক, আমরা তা চাই না। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিবিরকর্মীদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডাকসু ভিপি এসব কথা বলেন।
কেকে/ এমএস