মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ফের ঠান্ডা যুদ্ধে মহাকাশ প্রযুক্তি
ইসমাইল হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৮ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর কাজাখস্তান থেকে স্পুটনিক-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। প্রায় তিন মাস ধরে মাত্র ৮৩.৬ কিলোগ্রাম ওজনের স্যাটেলাইটটি প্রতি নব্বই মিনিটে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। স্পুটনিক-১-এর সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মানবজাতি মহাকাশের এক নতুন ইতিহাস রচনা করে। ত্রিশ হাজার বছর আগেও মানুষ আকাশ নিয়ে যে গবেষণা করত, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ষাটের দশকে প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার মারশ্যাকের প্রাণীর হাড়ে খোদাই করা দাগগুলোর ব্যাখ্যা থেকে। সে সময়ের পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন মানুষকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে মহাকাশে নিয়ে যায়। মানবজাতির অগ্রযাত্রার বড় অংশই এসেছে মহাকাশের দিকে হাত বাড়ানোর ইচ্ছা থেকে।

মহাকাশে পৌঁছে যাওয়া এবং তা জয় করা ছিল মানবজাতির কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়। স্নায়ুযুদ্ধে অস্ত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কৌশলগত হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) উভয়ই রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সফল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। স্পুটনিক উৎক্ষেপণের দুই মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভ্যানগার্ড টেস্ট ভেহিকল-৩’ কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ছোড়া হয়। সামান্য উঠতেই তা বিস্ফোরিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র বিরাট সমালোচনার মুখে পড়ে। সোভিয়েত তখন অনেকটা সমালোচনার সুরে বলেছিল—প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য আমাদের সহায়তার দরজা সবসময় খোলা।

অবশেষে ফন ব্রাউনের নকশা করা জুনো-১ রকেট ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে এক্সপ্লোরার-১ স্যাটেলাইটকে সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছে দেয়। হিটলারের পতনের পর অপারেশন পেপারক্লিপ নামক গোপন অভিযানের মাধ্যমে ফন ব্রাউনসহ ১৫০০ জন জার্মান বিজ্ঞানীকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়, যারা ব্যালিস্টিক কর্মসূচি ও সামরিক প্রযুক্তি উন্নত করতে কাজ করেন। রাশিয়াও অপারেশন ওসোভিয়াখিমের মাধ্যমে দুই হাজারেরও বেশি জার্মান বিজ্ঞানীকে নিজ দেশে আনে। দুই দেশের লক্ষ্য ছিল জার্মান বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিজেদের গোপন অস্ত্র ও প্রযুক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে উন্নত করা।

শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে স্যাটেলাইট প্রতিযোগিতা—কে আগে স্যাটেলাইট পাঠাবে, কে সবচেয়ে বড় অর্জন নিয়ে আসবে? এ প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে গেছে চাঁদ পর্যন্ত, আবার সেখান থেকে মঙ্গলের পথে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এ দশকে মানুষকে মঙ্গল গ্রহের মাটিতে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সত্যিই যদি মানুষ মঙ্গল ভ্রমণে যায়, তাহলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি কেমন হবে? বর্তমান সময়ে মহাকাশে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা ও শীতল যুদ্ধ চলছে। এর শুরুটা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলা স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই। পৃথিবীর রাজনীতি, ক্ষমতা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখন মহাকাশেও ছড়িয়ে পড়েছে। মহাকাশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নতুন সীমান্ত, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা চলছে।

বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। বাংলাদেশও এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তবে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মহাকাশের প্রধান শক্তি। তাদের রয়েছে শক্তিশালী সামরিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, যার মাধ্যমে খুব সহজেই শত্রু দেশের ওপর নজরদারি ও শত্রুর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়। একটি আধুনিক সামরিক স্যাটেলাইট প্রায় ১০–১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দেখতে সক্ষম। তাহলেই ভাবুন, একটি যুদ্ধে স্যাটেলাইট কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ইনফ্রারেড তাপচিহ্ন শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র সতর্কতামূলক স্যাটেলাইট তৈরিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। রাশিয়ার অ্যারোস্পেস ডিফেন্স বাহিনীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে স্যাটেলাইটনির্ভর অস্ত্র ব্যবহার করে ইরাকি সেনাবাহিনীকে কার্যত ধ্বংস করে ফেলে।

এরপর ২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্পেসএক্স ইউক্রেনে দ্রুত স্টারলিংক হাই-স্পিড ইন্টারনেট টার্মিনাল পাঠায়। ক্রেমলিন অভিযোগ তোলে, স্টারলিংক পেন্টাগনের অংশ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান সময়ে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা যুদ্ধে স্যাটেলাইটের সফল ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের নিখুঁত মিসাইল হামলায় চীন ও রাশিয়ার স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে একটি স্যাটেলাইট শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নেভিগেশন সিস্টেম, ইন্টারনেট সেবা, ছবি তোলা এবং টেলিভিশন সম্প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর ব্যবহার এখন বহুমুখী। নিঃসন্দেহে তা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্যাটেলাইট ছাড়া মানুষের জীবন এক ঘণ্টা কল্পনা করা বেশ কঠিন। পৃথিবী থেকে ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উচ্চতায় হাই আর্থ অরবিটে সামরিক, গোয়েন্দা নজরদারি, টেলিভিশন, রেডিও এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট অবস্থান করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো মহাকাশ প্রযুক্তিতে শক্তিশালী দেশের স্যাটেলাইট ঘুরছে।

১৯৭০ সালের ২৪ এপ্রিল চীন সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম উপগ্রহ স্থাপন করে। এরপর ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি থেকে নিয়মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ শুরু করে। ২০২০ সালে চীন নিজস্ব নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা তৈরি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস সিস্টেমের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। রাশিয়াও গ্লোনাস স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। গ্লোনাস বিশ্বব্যাপী নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের সমতুল্য। বেইজিং নিজেদের স্যাটেলাইট সেবা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দিতে চায়। এর মাধ্যমে দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানো এবং নিজেদের প্রভাব তৈরি করা মূল লক্ষ্য।

চীন ২০০৭ সালে পরীক্ষামূলক একটি গ্রাউন্ড-লঞ্চ অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্র দিয়ে মহাকাশে তাদের অকেজো আবহাওয়া উপগ্রহ ধ্বংস করে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৮ সালে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া ইউএসএ-১৯৩ গোপন নজরদারি স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। রাশিয়াও ২০২১ সালে তাদের পুরোনো উপগ্রহ একই প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে। এর ফলে মহাকাশে অসংখ্য বর্জ্য তৈরি হয়েছে। আবার এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের ফলে প্রতিটি দেশ নিজেদের উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।

মার্কিন নৌবাহিনী ২০১৪ সাল থেকেই লেজার ওয়েপন সিস্টেম ব্যবহার করছে। লেজার ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে ক্রুজ মিসাইল সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। লেজার অস্ত্র মহাকাশে ব্যবহার করার জন্য কাজ চলছে, কিন্তু এখনো মহাকাশে পুরোপুরি মোতায়েন করা হয়নি। তবে কোনো দেশ যদি মহাকাশে সত্যিই এটি মোতায়েন করে, তাহলে অন্য দেশ নিঃসন্দেহে একই পথে হাঁটবে।

মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর থেকেই নতুন এক রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এক দেশ অন্য দেশকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে হুমকি হিসেবে দেখলেও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস) এক সহযোগিতার বার্তা দেয়। সব রাজনৈতিক বাধাকে উপেক্ষা করে আইএসএস তৈরির লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। ১৯৯৮ সালের পর থেকে আইএসএস-এ বসবাস ও গবেষণার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়, যা ২০৩০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেবে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন বহুমাত্রিক। মহাকাশ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য যে আইন রয়েছে, তা অনেক পুরোনো এবং দিকনির্দেশনামূলক। মহাকাশ, চাঁদ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আউটার স্পেস ট্রিটি বা মহাকাশ চুক্তির আইন শান্তিপূর্ণ হলেও প্রযুক্তির অগ্রগতি সেই আইনগুলোকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাই আমাদের কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো আইন বাদ দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। তাহলেই শুধু মানবজাতির যৌথ সম্পদ হিসেবে মহাকাশ ধারণাটি রক্ষা পাবে। অন্যথায়, মানবজাতি মহাকাশে নতুন এক যুদ্ধের সাক্ষী হবে।

লেখক : গবেষক

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:   মহাকাশ   প্রযুক্তি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close