মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভারসাম্য ও স্থবির সংঘাতের রাজনীতি
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৩০ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি আর কোনো সীমিত আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়। এটি এমন এক জটিল ভূরাজনৈতিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সামরিক শক্তি, কূটনৈতিক অচলাবস্থা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতি একই সঙ্গে একে অপরকে প্রভাবিত করছে। উপরিভাগে এটিকে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হিসেবে দেখা গেলেও বাস্তবে এটি একটি অস্থিতিশীল কৌশলগত ভারসাম্য, যা স্থিতিশীল শান্তির দিকে যাচ্ছে না, আবার পূর্ণ যুদ্ধেও ফিরে যাচ্ছে না। বরং এটি ধীরে ধীরে স্থবির সংঘাতের দিকে সরে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এই ধরনের পরিস্থিতিকে স্থবির সংঘাত বলা হয়। এখানে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় না, আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধও নিয়মিতভাবে ঘটে না। এর পরিবর্তে দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমাত্রার উত্তেজনা, ছায়াযুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক নিষ্পত্তি না হলেও সংঘাতের কাঠামো সক্রিয় থাকে এবং পুনরায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি অটুট থাকে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সেই দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিশেষ করে পাকিস্তানে আলোচনার প্রচেষ্টা, প্রথমে কিছু সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা দ্রুতই অগ্রগতিহীন অবস্থায় পৌঁছে যায়। পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও তার ফলাফল নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এই সংকট বোঝার জন্য তিনটি কাঠামোগত বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি; দ্বিতীয়ত, সংঘাতের অসম প্রকৃতি; এবং তৃতীয়ত, মূল বিরোধগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অনিষ্পন্নতা। এই তিনটি উপাদান একত্রে বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতিকে কূটনৈতিক সমাধান নয়, বরং রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধবিরতি প্রায়ই একটি সাময়িক স্থিতাবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হয়ে বরং পরবর্তী উত্তেজনার কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

এই নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা হলো, এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি স্থিতি অর্জনকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো, পারমাণবিক ইস্যু এবং প্রভাব বলয়ের প্রতিযোগিতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। এই অমীমাংসিত বাস্তবতাই ভবিষ্যতের সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে। ইরানের অবস্থান এই কাঠামোর বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে। তারা এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে তারা অপ্রতিসম কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে রাজনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

এই ধরনের অপ্রতিসম সংঘাত সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। কারণ এখানে কোনো পক্ষই দ্রুত বা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারে না। শক্তিশালী পক্ষ সামরিকভাবে এগিয়ে থাকলেও দুর্বল পক্ষ কৌশলগতভাবে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে একটি স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়, যেখানে যুদ্ধও নেই, শান্তিও নেই।

হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এই বাস্তবতাকে আরও তীব্র করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এই কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর আঞ্চলিক ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, নৌ-চলাচলে বাধা, ড্রোন হামলা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা এবং প্রতিরোধমূলক কৌশলের মধ্যে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়েছে, যা যে কোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

এই সংঘাতে ইসরায়েলের ভূমিকা সরাসরি এবং পরোক্ষ—উভয়ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েন্দা অভিযান, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কার্যক্রম এবং ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে তারা ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নিরাপত্তা কার্যক্রম এই উত্তেজনাকে আরও গভীর করছে।

পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। দেশটি সংলাপের একটি সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছে। তবে প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি এবং মৌলিক বিরোধের অমীমাংসিত থাকা এই প্রক্রিয়াকে কার্যকর হতে দিচ্ছে না।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সংঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে।

এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা একসঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতাকে আরও গভীর করছে। একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে সংঘাত ও চাপ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি একটি অনিশ্চিত ভারসাম্যে প্রবেশ করেছে।

পারমাণবিক ইস্যু এই সংঘাতের কেন্দ্রীয় অমীমাংসিত প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখলেও ইরান এটিকে সার্বভৌম অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই মৌলিক অবস্থানগত পার্থক্য এখনো কোনো কার্যকর সমাধানের দিকে এগোয়নি।২০১৫ সালের বহুপাক্ষিক চুক্তি একসময় এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই কাঠামো ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি আবার অনিশ্চয়তায় ফিরে যায়।
ইতিহাস বলছে, এ ধরনের বিরোধের সমাধান দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে আংশিক সমঝোতার মাধ্যমেই অস্থায়ী স্থিতি তৈরি হয়।

তবে আংশিক সমঝোতা কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের নতুন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে, যেখানে কিছু প্রযুক্তিগত সমঝোতা হলেও মূল রাজনৈতিক বিরোধ অমীমাংসিত থেকে যাবে।

এই পুরো কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতা। কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের অবস্থানে নেই। ফলে প্রতিটি পক্ষ অন্য পক্ষকে দীর্ঘমেয়াদে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল গ্রহণ করছে। এই কৌশল সংঘাতকে স্থায়ীভাবে অনিশ্চিত করে তুলছে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আকস্মিক বড় সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাওয়া। নিম্নমাত্রার উত্তেজনা সবসময় নিয়ন্ত্রিত থাকে না; সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও দ্রুত বড় যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে সামরিক ও কৌশলগত উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। এ দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সংঘাত ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী অস্থির কাঠামোতে রূপ নিতে পারে, যেখানে যুদ্ধ শেষ হবে না এবং শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং একটি নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার দীর্ঘ চক্র চলতে থাকবে, যা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত বাস্তবতা তাই কেবল আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি কেন্দ্রীয় মোড়। এই সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সহজ বা দ্রুত কোনো সমাধান এখন আর বাস্তবসম্মত নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  মধ্যপ্রাচ্যে   অস্থির ভারসাম্য   রাজনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close