দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসের কারণে সুরমা, কুশিয়ারা, বাউলাই নদীসহ অন্যান্য নদনদীর পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে সুনামগঞ্জে হাওরে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ২৮ এপ্রিলের পূর্বে হাওরের ৮০ শতাংশ পেকে যাওয়া ধান কাটতে কৃষকদের অনুরোধ জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এদিকে জেলার সব কটি হাওরে দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। নিচু ও জলাবদ্ধ জমিতে ধান কাটতে পারছে না হারভেস্টরা মেশিন। ফলে পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে বিপাকে চাষিরা। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে হাওরের পাকা ধান কাটতে প্রয়োজনীয় সহযোগীতার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সরজমিনে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে পাকা ও আঁধাপাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। চোখ যেদিকে যায় বিস্তৃত দিগন্তজোড়া ফসলি জমি কৃষকের মন আনন্দলিত করলেও কষ্টের এই ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। অতিবৃষ্টির কবলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় অনেকেই কৃষক হারিয়েছেন ফসল। নতুন করে আগাম বন্যার পূর্বভাস হাওরের কৃষকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমুহের বরাত দিয়ে আগামী ৭ দিনের ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বভাস জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২৩ এপ্রিল রাতে জারিকৃত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে ২৪-২৬ এপ্রিল হাল্কা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত, ২৭ এপ্রিল মাঝারি হতে ভারি এবং ২৮-৩০ এপ্রিল অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
এতে হাওরের প্রধান নদীসমূহ সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু, বাউলাইসহ বিভিন্ন নদনদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে সমতল অতিক্রম করতে পারে। এতো আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়। তাই ২৮ এপ্রলের মধ্যে হাওরের ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কর্তনে কৃষকদের জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌলী মামুন হাওলাদার।
উজানে অতি ভারি বৃষ্টিপাত ও আগাম বন্যার পূর্বাভাসে হাওরে পাকা ও আঁধাপাকা ধান নিয়ে শঙ্কিত কৃষকরা।
হাওর পাড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, জেলার বেশিরভাগ হাওরে আঁধা পাকা অবস্থায় রয়েছে যেসব জমির ফসল পেঁকেছে তা শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারছেন না। জন প্রতি ৭০০-৮০০ টাকা দিয়েও ধানকাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে জেলার সবকটি হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। জলমগ্ন জমিতে কম্বাইন হাভেস্টার মেশিন ধান কাটা যাচ্ছে না। এতোদিন মেশিন নির্ভর জমিগুলো ধান কাটতে প্রয়োজন পড়ছে স্থানীয় শ্রমিক। তবে শ্রমিকের সংস্থান না পাওয়ায় বিরম্ভনায় কৃষকরা।
শান্তিগঞ্জের ছয়হারা গ্রামের এলখাছ মিয়া বলেন, ‘ধান কাটা লইয়া বিপদে আছি। ধান কাটরা পাইরাম। ৭০০-৮০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাইনা। বাধ্য হয়ে নিজেরা ধান কাটরাম।’
সুলেমনা মিয়া বলেন, ‘কৃষি অফিস কয় ধান কাটতাম। শ্রমিকতো নাই। তারা আমরারে শ্রমিক মিলাইয়া দেউক। ধান কাটার মেশিনও পাইনা, শ্রমিকও পাইনা। বড় বিপদে আছি।’
হাওরের শ্রমিক সংকটের নিরসনের শ্রমিক সংগ্রহে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বাহির জেলা থেকে শ্রমিক নিয়ে আসতে চেষ্টা করা হচ্ছে। বালিমহাল, ক্রাসার মিল বন্ধ রাখা হয়েছে।
কোনো কৃষক শ্রমিক সংকটে ভোগলে আমাদের জানালে শ্রমিকের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলেন তিনি।
জেলায় শুক্রবার পর্যন্ত মোট আবাদকৃত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরের মধ্যে ৪৮ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমির ধান কর্তন হয়েছে, যা শতকরা ২২ % এর উপরে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যথাযথ পদক্ষেপে হাওরের কৃষকরা ধান গোলায় তুলবেন এমনটাই প্রত্যাশা হাওরবাসীর।
কেকে/ এমএস