মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
সিন্ডিকেট ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি
আবু আফজাল সালেহ
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২১ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৯ এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম কার্যকর হয়েছে। এক লাফে অনেক বেড়েছে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম। কয়েকদিন আগে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বৈশ্বিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এ সংকটের দাম বাড়িয়ে নিরসনের চেষ্টা সরকার করছে। এটি মোটামুটি ভালো একটি উদ্যোগ। অনেক দেশে আগেই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সংকট আসলে বিশ্বব্যাপীই। তবে তেল সংকট পরবর্তীতে মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতে অন্যান্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেবে। মূল্য বেড়ে যাবে সব জিনিসের, খরচ বাড়বে যাতায়াত ও পরিবহনে। মূলত এ কারণেই সবকিছুতেই অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

আর আমরা তো সবকিছুতেই সিন্ডিকেট আছেই! সিন্ডিকেট সংকট বাড়িয়ে দেয়, অস্থিরতা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে অনেক সময় সরকারও অসহায় হয়ে পড়ে। আবেগী জনগণ নিজেদেরটা বুঝে চুপ থেকে বিভিন্ন সংকটকে দৃশ্যমান করে তোলে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে। এ প্রবণতা সবসময়ই চলে। কোথায় নেই সিন্ডিকেট? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, চাকরি—প্রভৃতি ক্ষেত্রে চলছে এ কৃত্রিম সিস্টেম।

জ্বালানি সংকট অন্যান্য সংকটকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট করোনা সময়ের মতো, ধাক্কাটি একসঙ্গে নয় বরং ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাবে। এবং বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করে বৃহত্তর সংকট তৈরি করতে পারে। বিশ্বের এ অস্থিরতা কতদিন থাকবে তা বলা যাচ্ছে না। একটি সুখবর পেতে না পেতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেতিবাচক খবর ভাবিয়ে তুলছে। অর্থনীতি ও শেয়ারবাজার হুমকির মুখে। জ্বালানি তেল সংকট কার্যত আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বারবার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ তেল সংকট অন্যান্য সংকটকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে, আবার নতুন কিছু সংকটও সৃষ্টি করছে।

ইরানে যুদ্ধের এক মাস পর অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি আরও খারাপ কিছুতে রূপ নিতে পারে—প্রায় সবকিছুর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ সংকুচিত করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহকে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এই বিঘ্ন শুধু জ্বালানির দামই বাড়ায়নি, বরং দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোকেমিক্যালের সরবরাহও সংকুচিত করেছে—যেমন জুতা, পোশাক এবং প্লাস্টিকের ব্যাগ।

এই চাপ এখন ভোক্তা বাজারের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ প্লাস্টিক, রাবার এবং পলিয়েস্টারের মতো উপকরণের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব এশিয়ায় সবচেয়ে স্পষ্ট, যা বিশ্বের উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে এবং তেল ও অন্যান্য পণ্যের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পোশাক ও প্লাস্টিক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশও হুমকির মুখে পড়বে সম্ভাবনাময় এ দুই শিল্প। কর্মসংস্থান হারাতে পারেন অনেকে। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে এটাও একটি কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের নড়েচড়ে বসতে হবে। বিকল্প উপায় খুঁজতে বা বের করতে হবে।

তাইওয়ান প্লাস্টিকের অভাবের কারণে প্রস্তুতকারকদের জন্য একটি হটলাইন শুরু করেছে। জাপানে তেল সংকটের ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি ব্যর্থতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হেমোডায়ালিসিস প্লাস্টিক টিউবের অভাব দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার গ্লাভ প্রস্তুতকারকরা জানিয়েছেন, রাবার ল্যাটেক্স তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় একটি পেট্রোলিয়াম উপাদানের অভাব বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা গ্লাভের সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে।

পণ্য ও উৎপাদনের মধ্যে অস্থিরতা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভারী প্রভাব ফেলছে। প্রস্তুতকারকরা শক্তি ও কাঁচামালের জন্য বেশি অর্থ দিচ্ছেন, যা লাভের মার্জিন কমিয়ে দিচ্ছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়াচ্ছে। বাড়তি জ্বালানির খরচ ভ্রমণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অন্যান্য উপকরণের সংকট—যেমন সার ও হিলিয়াম—খাদ্য ও ইলেকট্রনিক্সের দাম বাড়িয়ে দেবে।

থাইল্যান্ডে রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান এবং টেকআউট ডেলিভারির জন্য ব্যবহৃত স্বচ্ছ সেলোফেন ব্যাগের দাম ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া জানিয়েছে, বোতলজাত পানির দাম বাড়ছে; যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্লাস্টিক বোতলের ঢাকনার দাম চারগুণ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ইনস্ট্যান্ট নুডল প্রস্তুতকারক নংশিম বলেছে, তাদের প্লাস্টিক প্যাকেজিং সরবরাহকারীর কাছে বর্তমানে প্রায় এক মাসের সরবরাহ অবশিষ্ট রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে প্রায় ১৭% ন্যাফথা এবং ৩০% প্লাস্টিক রেজিন উৎপাদনের পাশাপাশি ৪৫% সালফার সরবরাহ করে, যা সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়; ৩৩% হিলিয়াম, যা সেমিকন্ডাক্টর, স্বাস্থ্যসেবা ও মহাকাশে ব্যবহৃত হয়; এবং ২২% ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া, যা ফসলের পুষ্টিতে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন কৃষকরা ইতোমধ্যেই সারের জন্য বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমদানি করা ইউরিয়ার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এশিয়ার দেশগুলো তেলের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে মনোযোগ দিয়েছে—যেমন তেল মজুত মুক্ত করা, জ্বালানির দাম সীমিত করা এবং শক্তি সাশ্রয়ের জন্য কাজের ঘণ্টা কমানো ইত্যাদি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এপ্রিল মাসের পর আরও তীব্র হবে, কারণ যুদ্ধের আগে পাঠানো শেষ অপরিশোধিত তেল এই মাসের শুরুতেই পৌঁছানোর কথা।

চীনের অনেক স্থানে কাপড় তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পলিয়েস্টার চিপের দাম প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ায় গত মাসে (মার্চ) প্লাস্টিকের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশনের মতে, কাগজ, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম বা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের মতো বিকল্প উপকরণ ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্পে ফিরে আসা দরকার। এমন জটিল প্রভাব আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়াবে।

করোনা জটিলতা একবারে ধ্বংস ডেকে আনলেও তেল সংকট ধীরে ধীরে বিভিন্ন সংকটকে ভয়ঙ্করের দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী যে সংকটগুলোর কথা আলোচনায় এসেছে, তার সবই বাংলাদেশে কিছুদিনের মধ্যেই প্রভাব ফেলবে। এর বাইরেও অনেক সংকট বা জ্বালা ছড়িয়ে পড়বে। জ্বালানি সংকট নিরসনে অবহেলার সুযোগ নেই। যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে—গণছুটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে, সপ্তাহে এক বা দুই দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্যও।

সিন্ডিকেট, গুজব ও অপতথ্য সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। উদাসীনতা বা অবহেলা সরকার পতনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তাই এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সমালোচনা থাকবে, তবে অপতথ্য বা গুজব কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না। সিন্ডিকেট বিষয়ে নমনীয় হলে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে পারে।

সরকারকে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। হরমুজ প্রণালীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কিছু খাতে এশিয়ার স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর লাগবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুক্তিযুক্ত সমাধানের জন্য সব পক্ষকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসা দরকার।

দেশের যে কোনো সংকটে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট সুযোগ নেয়। অথচ বিদেশে সংকটের সময় সবাই সমাধানে সহযোগিতা করে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। সিন্ডিকেট যেকোনো সংকটকে বাড়িয়ে দেয় বা নতুন সংকট তৈরি করে। জ্বালানি তেলেও সিন্ডিকেট ও মজুতদাররা সংকট তৈরি করছে। সরকার সংকট নিরসনের চেষ্টা করছে, তবে সঠিক তথ্য প্রচার করে জনগণের সহযোগিতা নেওয়া জরুরি।

তেল-গ্যাসসহ সব খাতে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। পাশাপাশি সংকট নিরসনে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নও জরুরি।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  অর্থনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close