দেশের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সতর্কতা—উভয়ই একটি ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলসহ সারাদেশে ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের কারণে খাদ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার যে পূর্বাভাস জাতিসংঘ দিয়েছে, তা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। বর্তমান বাস্তবতায় আবহাওয়া ও খাদ্যনিরাপত্তা আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখনই সুদূরপ্রসারী ও নির্দেশনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পরিস্থিতি ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক। ভারতের বড় অংশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় বছরের প্রায় ২৫০ দিন, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সময় কৃষকদের পক্ষে বাইরে কাজ করা অনিরাপদ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবাদিপশুর ওপর তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আগেই। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই তাপজনিত চাপ শুরু হয়। গরম বাড়লে দুধের উৎপাদন কমে, কমে দুধের চর্বি ও প্রোটিনের পরিমাণও। শুকর ও মুরগি ঘামতে পারে না বলে তাপমাত্রা বাড়লে তাদের হজমতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে, এমনকি হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হয়।
তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে অধিকাংশ ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করে। কিছু এলাকায় ভুট্টার উৎপাদন ইতোমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। গমেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক এবং রিকশাচালকদের মতো যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তাদের কাজের সময় পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দিনের প্রখর রোদে কাজ কমিয়ে ভোরে বা বিকেলে কাজ করার জন্য জাতীয় নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া শিল্প-কারখানা ও খামারে শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুপেয় পানি, বিশ্রাম এবং ছায়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের বিপর্যয় রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা গেলে ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। বাংলাদেশে চলমান ৩৮–৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বোরো ধানসহ অন্যান্য রবি শস্যের জন্য বড় হুমকি। সেচের পানি নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং কৃষকদের আধুনিক কৃষি-সরঞ্জাম সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে গবাদিপশু ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় খামারিদের জন্য বিশেষ পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে। মলি অ্যান্ডারসন যেমনটি সতর্ক করেছেন, শিল্পভিত্তিক একফসলি চাষ পদ্ধতি চরম আবহাওয়ার ধাক্কা সামলাতে অক্ষম। সরকারকে এখন থেকেই লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন এবং কৃষকদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এখনই আমরা যদি যথাযথ ব্যবস্থা না নিই, তবে তীব্র তাপপ্রবাহে আগামীর খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কেকে/এলএ