মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে এসএসসি-এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ
ড. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: রোববার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে- যেখানে আলো থাকা সত্ত্বেও অন্ধকারে বসবাস করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর নানা পরিসংখ্যান, উন্নয়নের গল্প, অবকাঠামোগত অগ্রগতির গর্ব- এসব কাগজে-কলমে যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, বাস্তব জীবনে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

বিশেষ করে রাজশাহীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং এখন আর সাময়িক অসুবিধা নয়, বরং এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম- এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।

একসময় লোডশেডিং ছিল একটি পরিচিত শব্দ, কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রীয় বাস্তবতা। দিনে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা অনুপস্থিত থাকা- এ যেন এক অবিরাম দুঃস্বপ্ন। বিশেষ করে ভদ্রা, পদ্মা আবাসিক, উপশহরের মতো তুলনামূলক উন্নত এলাকাগুলোতেও যখন একই চিত্র দেখা যায়, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি কতটা গভীর।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা চলমান, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এই দুই পরীক্ষাই শিক্ষাজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রস্তুতি যথাযথভাবে নিতে পারছে না। রাতের পড়াশোনা- যা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের একটি অভ্যাস- তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের পড়াশোনার বড় একটি অংশ নির্ভর করে বিদ্যুতের ওপর- অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল নোট, ইউটিউব লেকচার, পিডিএফ বই-সবই বিদ্যুৎ ছাড়া অচল। হঠাৎ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ না থাকলে তারা যেন সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকলে শারীরিক অস্বস্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মনোযোগ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি নিজে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে অভিজ্ঞতা শুনছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক এসএসসি পরীক্ষার্থী জানাচ্ছে, তারা পড়ার টেবিলে বসতে পারছে না, কারণ বিদ্যুৎ নেই, বাতাস নেই, ঘরে অসহনীয় গরম। কেউ কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাতেও দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা যাচ্ছে না। হারিকেন বা মোমবাতির আলো শুধু আলোই দেয় না, দেয় ক্লান্তি, চোখের চাপ এবং মানসিক অস্থিরতা।

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অবস্থা আরও করুণ। তারা বলছে, তাদের সিলেবাস অনেক বড়, প্রস্তুতির জন্য ধারাবাহিক মনোযোগ দরকার। কিন্তু লোডশেডিং সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে দিচ্ছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে মনোযোগী হওয়ার ঠিক সময়েই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, ফলে পড়াশোনার গতি বারবার থেমে যাচ্ছে। এতে শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে না, মানসিক চাপও বাড়ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই প্রজন্ম কখনো এমন দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে বড় হয়নি। তারা সবসময় একটি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল। ফলে হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে মোমবাতি বা হারিকেন ব্যবহার করা আজকের যুগে শুধু অপ্রাসঙ্গিকই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর।

বিদ্যুৎ সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মাথাব্যথা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা- এসব এখন নিত্যসঙ্গী। একজন অসুস্থ শিক্ষার্থী কখনোই তার সেরাটা দিতে পারে না। ফলে এই সংকট সরাসরি তাদের পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলছে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে- এই দায় কার? একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। যদি সেই শিক্ষার্থীরাই মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে উন্নয়নের সব গল্পই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, এটি এখন শিক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান।

লোডশেডিংয়ের এই সংকটকে শুধু অভিযোগের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না- বাস্তবসম্মত, দ্রুত কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একসাথে ভাবতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে সমাধানগুলো তিনটি স্তরে ভাবা যায় : তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি।

প্রথমত, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে পরীক্ষার্থীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার চাইলে নির্দিষ্ট সময়সূচি করে (বিশেষ করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত) এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য লোডশেডিং বন্ধ রাখতে পারে। এলাকাভিত্তিক “স্টাডি আওয়ার” ঘোষণা করে এই সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়া বাস্তবসম্মত একটি পদক্ষেপ। পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ড ও প্রশাসন যৌথভাবে পরীক্ষার সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করতে পারে যাতে অতিরিক্ত চাপ কমে।

দ্বিতীয়ত, স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিকল্প ব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। শুধু মোমবাতি বা হারিকেন নয়- স্বল্প খরচে চার্জেবল লাইট, সোলার ল্যাম্প বা ব্যাটারিচালিত ফ্যান শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য করা যেতে পারে। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন চাইলে বিশেষ ভর্তুকি বা সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে এসব সরঞ্জাম পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে পারে। স্কুল-কলেজগুলোও চাইলে নিজেদের উদ্যোগে “স্টাডি সাপোর্ট সেন্টার” চালু করতে পারে, যেখানে জেনারেটর বা সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে পড়াশোনা করতে পারবে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনার ঘাটতি, উৎপাদন- চাহিদার ভারসাম্যহীনতা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর না করলে এই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির (বিশেষ করে সৌরশক্তি) ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকায় ধীরে ধীরে সোলার সিস্টেম স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে অন্তত জরুরি সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোথায় কেন লোডশেডিং হচ্ছে, কত সময় থাকবে- এসব তথ্য আগেভাগে জানালে মানুষ নিজেদের কাজ পরিকল্পনা করতে পারবে। অনিশ্চয়তাই এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা।

অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন- শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প প্রস্তুতির দিকনির্দেশনা দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত আকারে সরবরাহ করা এবং মানসিকভাবে তাদের সমর্থন দেওয়া। কারণ এই সংকট শুধু শারীরিক নয়, এটি মানসিকভাবেও শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলছে।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত সন্তানদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া এবং সম্ভব হলে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করা। যদিও সব পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তবুও সচেতনতা একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে বলতে হয়, এই লোডশেডিং শুধুমাত্র একটি সাময়িক সমস্যা নয়- এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, উন্নয়নের যে ভিত্তির ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। আর সেই ঘাটতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীদের।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই অন্ধকারে গড়ে উঠতে পারে না। আজ যদি আমরা এই শিক্ষার্থীদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করতে না পারি, তাহলে আগামী দিনে তারা আমাদের জন্য আলো নিয়ে আসবে-এই প্রত্যাশাও আমরা করতে পারি না। তাই এখনই সময়- এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার।

লেখক : শিক্ষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close