সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ইরান যুদ্ধ ও আগামীর সবুজ জ্বালানি
এম আর লিটন
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইরান যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু কর্মীরা ইতিবাচক দিক খুঁজে পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র মিনাবের স্কুলে আঘাত হানা, উপসাগরে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও তেহরানের আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়ার পরিস্থিতিকে ‘জ্বালানি সংকটের জননী’ বলা হচ্ছে। 

পরিবেশবাদীদের মতে, এ সংকটই বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্র বদলে দেওয়ার সুযোগ এনেছে। যুদ্ধ সবুজ রূপান্তরকে গতিশীল করবে। এখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানিই সবচেয়ে নিরাপদ ও অনিবার্য বিকল্প। যুক্তিটি বেশ জোরালো। কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটি বিশ্বের তৃতীয় বড় জ্বালানি বিপর্যয়। জীবাশ্ম জ্বালানি এখন শুধু ব্যয়বহুল নয়, ভূ-রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এটি অশুভ শক্তির হাতে জিম্মি হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয়ী ও প্রচুর। এটি নিজস্ব দেশীয় সম্পদ। অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে এর নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি থাকে না।

যুদ্ধের শুরুতে অনেক সংশয় ছিল। অনেকে ভেবেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো এটিও শুধু ইউরোপে সবুজ জ্বালানি বাড়াবে। স্বল্পমেয়াদে সংকটের প্রতিক্রিয়া সুশৃঙ্খল হয় না। সার, খাদ্য ও সেমিকন্ডাক্টর বাজারে ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়। অনেকে জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ার খবর আসছিল। অনেক দেশ কয়লায় ফেরার কথা ভাবছিল। একে ‘রূপান্তরকালীন যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাজারের পরিস্থিতি বোঝা তখন কঠিন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের ভুল তথ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। যুদ্ধ শুরুর অল্প সময়েই সবুজ জ্বালানি বড় ধাক্কা সামলে নিয়েছে। প্রথম মাসে বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার বাড়েনি। চীন ছাড়া অন্য দেশে তা বরং কমেছে। এশিয়ায় জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ও কর্মঘণ্টা কমিয়ে চাহিদা কমানো হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘাটতি মিটিয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে কয়লার ব্যবহার যতটুকু কমেছে, বায়ু শক্তি বেড়েছে তার দ্বিগুণ। সৌরশক্তির উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের বেশি। এটি সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। যুদ্ধের প্রভাবে আট সপ্তাহের মধ্যে নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর সঙ্গে সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। 

চীনের সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যান রপ্তানি ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এত দিন চীনের ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ নিয়ে সমালোচনা ছিল। এখন ওই সক্ষমতাই সংকটে বিশ্বের বড় সুরক্ষা কবজ। ফ্রান্স, মিশর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক নতুন সবুজ জ্বালানি নীতি ঘোষণা করেছে। ইউরোপীয় কমিশন বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের তাগিদ দিয়েছে। এ বছর সবুজ জ্বালানিতে মাসিক ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

জ্বালানি রূপান্তরের বৈশ্বিক হাওয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সোলার পার্ক ও কারখানার ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। কক্সবাজারে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু এ ক্ষেত্রে বড় অর্জন। তবে ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কৃষিজমি রক্ষা করে বড় প্রকল্প করা কঠিন। ভূমিসংকট কাটিয়ে টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশও সবুজ রূপান্তরে বড় অংশীদার হবে।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে সবুজ জ্বালানির সাফল্য উদ্যাপন অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। নতুন প্রতিবেদনগুলো দীর্ঘমেয়াদি আশার চিত্র দেখাচ্ছে। এ উত্থান হঠাৎ ঘটা কোনো পরিবর্তন নয়। এটি আগে থেকে চলমান প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পরিবর্তন বা ভেনেজুয়েলায় অস্থিরতা সত্ত্বেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদার পুরোটা মিটিয়েছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। সবুজ জ্বালানির প্রসারে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে। এক সময় প্রশ্ন ছিল, সবুজ জ্বালানি কি জীবাশ্ম জ্বালানির জায়গা নিতে পারবে? ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি কয়লাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রধান বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে।

সৌরশক্তি এখন সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার ৭৫ শতাংশই মিটিয়েছে সৌর প্যানেল। ২০১৫ সালের পর থেকে সৌরশক্তির উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণের বেশি। একইভাবে ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়নও চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালে ব্যাটারি স্টোরেজ ক্ষমতা ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি এখন ১২ গুণ বেশি। 

খরচ কমায় সৌরশক্তির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সহজ হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঞ্চলে ব্যাটারি স্টোরেজ এখন বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ সামাল দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব থাকলেও তথ্যের গভীরে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্বের শীর্ষ চার কার্বন নিঃসরণকারী অঞ্চলের তিনটিতেই কয়লার ব্যবহার কমেছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রে এটি কিছুটা বেড়েছে। তবু যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ ‘পেট্রোস্টেট’ বলা যাবে না। 

গত বছর দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নয় গুণ বেশি সবুজ জ্বালানি অবকাঠামো তৈরি করেছে। এ বছর নতুন জ্বালানি পরিকল্পনার ৯৩ শতাংশই পরিবেশবান্ধব। গত মাসেই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্যাসের ব্যবহারকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে জ্বালানি রূপান্তর আর জলবায়ু পরিবর্তন এক নয়। 

সবুজ জ্বালানির আলোচনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো জরুরি বিষয়গুলো এখন আড়ালে চলে যাচ্ছে। নেতারা একে শুধু ‘জ্বালানি রূপান্তর’ হিসেবে দেখছেন। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থামেনি। লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানল থেকে শুরু করে তীব্র তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। 

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আটলান্টিক মহাসাগরের সঞ্চালন ব্যবস্থা বা ‘এমোক’ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। এমনটি ঘটলে ইউরোপের তাপমাত্রা কমে যাবে। এতে আফ্রিকা ও ভারতের কৃষিতে বিপর্যয় নামবে। জ্বালানি রূপান্তর এক বিস্ময়কর সাফল্য। তবে জলবায়ুর পুরোনো সংকটগুলো এখনো বর্তমান। প্রচুর সবুজ জ্বালানি থাকা সত্ত্বেও বড় ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে হবে। 

আগামীর দশকগুলোতে সাশ্রয়ী সবুজ জ্বালানির জয়গান গাইব ঠিকই, সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিপর্যয়গুলোও সামলাতে হবে। এই যুদ্ধ বুঝিয়ে দিল, জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ শেষ হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও আহ্বায়ক, মুভমেন্ট ফর নেচার (পরিবেশবাদী সংগঠন)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close