রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, সমাজের দর্পণ কিংবা গণতন্ত্রের পাহারাদার সাংবাদিকতা পেশাকে ঘিরে এ জাতীয় অনেক গালভরা উপাধি আমাদের সমাজে প্রচলিত। ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে এসেছি, সাংবাদিকরা সত্যের সন্ধানে লড়েন, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেন এবং জনমত গঠন করেন।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আদর্শিক ধারণাটি কেবল একটি বিপণন কৌশল বা ‘রোমান্টিসিজম’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির নানা বাঁক পেরিয়ে আমরা আজ এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে কোনো পেশাই আসলে তথাকথিত ‘মহান’ নয়; বরং প্রতিটি পেশাই কোনো না কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
আমাদের সাধারণ ধারণা হলো, গণমাধ্যম তা-ই দেখায় যা মানুষ দেখতে চায়। একে বলা হয় ‘চাহিদা ও জোগানের’ নীতি। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আসলে ঘটে এর উল্টোটা। গণমাধ্যম যা দেখাতে চায়, মানুষ আসলে তা-ই দেখে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের চিন্তা, রুচি এমনকি তাদের ক্ষোভ প্রকাশের ধরনটিও আজ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অদৃশ্য কিছু সুতার টানে। আমরা কী নিয়ে কথা বলব, কাল সকালে চায়ের কাপে কোন বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করব তা আমাদের অজান্তেই ঠিক করে দিচ্ছে বড় বড় নিউজ রুমের এডিটর বা তাদের পেছনে থাকা পুঁজিদাতারা।
বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি তার ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ গ্রন্থে এই চরম সত্যটিই তুলে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুঁজিবাদ কীভাবে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে মানুষের ‘সম্মতি’ উৎপাদন করে। অর্থাৎ, আপনাকে কোনো বন্দুকের নলে বাধ্য করা হবে না, বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হবে যেখানে আপনি স্বেচ্ছায় তাদের এজেন্ডাকে নিজের বলে মেনে নেবেন। চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান পাঁচটি ফিল্টারের কথা বলেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে একটি তথ্যকে পার হতে হয় সংবাদ হয়ে ওঠার আগে।
প্রথম ফিল্টারটি হলো মালিকানা। বর্তমান পৃথিবীতে ছোট-বড় অগণতি সংবাদমাধ্যম দেখা গেলেও সেগুলোর প্রকৃত মালিকানা কিন্তু ঘুরেফিরে গুটিকয়েক বড় করপোরেট হাউজ বা ‘বিগ ব্রাদার্স’-এর হাতে। একজন পুঁজিপতি যখন গণমাধ্যম তৈরি করেন, তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য থাকে নিজের অন্যান্য ব্যবসার সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা। ফলে সেই মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের পরিপন্থি কোনো খবর যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তা ওই সংবাদমাধ্যমে কখনোই প্রকাশিত হয় না। সংবাদকর্মী হিসেবে চাইলেও কেউ সেই অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করতে পারেন না।
বিজ্ঞাপনের প্রভাব। একটি সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল পরিচালনার বিশাল খরচ কিন্তু কেবল গ্রাহকের সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে চলে না। এর মূল চালিকাশক্তি হলো বিজ্ঞাপন। চমস্কি বলেছিলেন, গণমাধ্যম আসলে পাঠকদের কাছে খবর বিক্রি করে না, বরং তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তাদের ‘পাঠক বা দর্শকদের’ বিক্রি করে। বিজ্ঞাপনদাতারা বড় বড় কোম্পানি, আর স্বাভাবিকভাবেই কোনো সংবাদমাধ্যম তাদের সবচেয়ে বড় অর্থদাতাকে চটানোর সাহস পায় না। ফলে যে তথ্যে বড় প্রতিষ্ঠানের শোষণ বা পরিবেশ ধ্বংসের চিত্র ফুটে ওঠে, তা বিজ্ঞাপনের চাপে সংবাদপত্রের কোণঠাসা পাতায় হারিয়ে যায়।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফিল্টার হলো তথ্যের উৎস। সাংবাদিকরা অধিকাংশ সময় তথ্যের জন্য সরকারি আমলা, বড় বড় করপোরেশনের পিআর (চজ) এজেন্সি বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এই উৎসগুলো তথ্যকে এমনভাবে সাজিয়ে (ঝঢ়রহ) মিডিয়ায় পরিবেশন করে যাতে তাদের ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে এবং সাফল্য বড় হয়ে দেখা দেয়। সংবাদমাধ্যম অনেক সময় সময় বা সম্পদের অভাবে এই ‘ফিড করা’ তথ্যগুলোকেই ধ্রুব সত্য বলে চালিয়ে দেয়।
চতুর্থ ফিল্টারটি হলো ‘ফ্ল্যাক’ বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। যদি কোনো সাহসী সাংবাদিক বা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে সত্য প্রকাশের সাহস দেখায়, তবে তাকে সিস্টেমের পক্ষ থেকে তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হয়। এটি হতে পারে আইনি মামলা, সোশ্যাল মিডিয়া ট্রলিং কিংবা সরকারি বিজ্ঞাপনী বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া। এই ভয়ের সংস্কৃতি সাংবাদিকদের মনে একটি স্থায়ী ‘স্ব-সেন্সরশিপ’ তৈরি করে। তারা বুঝে যান কোন সীমারেখার বাইরে যাওয়া যাবে না।
সর্বশেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ফিল্টারটি হলো আদর্শিক ভয় বা সাধারণ শত্রু তৈরি করা। জনগণকে সবসময় কোনো না কোনো অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে রাখা হয়। এক সময় সেটি ছিল কমিউনিজমের ভয়, পরে এসেছে সন্ত্রাসবাদের ভয় বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা। এই ভয়ের আড়ালে পুঁজিবাদের আসল শোষণ এবং আমজনতার মৌলিক সমস্যাগুলো ঢাকা পড়ে যায়। মিডিয়া যখন দিনরাত আপনাকে শেখায় কে আপনার শত্রু, তখন আপনি নিজের পকেটের টাকা কে কেড়ে নিচ্ছে তা খেয়াল করার সুযোগ পান না।
এই পাঁচটি ফিল্টার পার হয়ে যখন একটি তথ্য আমাদের মোবাইল স্ক্রিনে বা ড্রইংরুমের টিভিতে পৌঁছায়, তখন সেটি আর নিছক ‘তথ্য’ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একটি ‘পণ্য’। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সংবাদ কেবল তথ্য দেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সাইকোলজিক্যাল টুল বা মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বিগ ব্রাদাররা নির্ধারণ করে দেন কতটুকু আপনি জানবেন আর কতটুকু জানলে তাদের গদিতে টান পড়বে না।
তাই বর্তমান সময়ে তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করেও প্রকৃত সত্য খুঁজে পাওয়া এক বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্যের বন্যায় ভেসে যাওয়ার চেয়ে তথ্যের নেপথ্যের রাজনীতিটা বুঝতে পারাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, আধুনিক দুনিয়ায় তথ্যের চেয়ে বড় মারণাস্ত্র আর দ্বিতীয়টি নেই।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস