বই পড়েই মানুষ মহৎ হয়েছে, জ্ঞানীরা জ্ঞানের গভীরে পৌঁছেছে, আর কবি-লেখকরা তাদের চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে শাণিত করেছেন। এজন্য বলা হয় বই আমাদের পরম বন্ধু। একটি সমাজের মেরুদণ্ড তার চিন্তা, আর সেই চিন্তার প্রধান জ্বালানি পাঠ্যাভ্যাস।
বই, পত্রিকা, প্রবন্ধ এসব শুধু তথ্যের ভাণ্ডার নয়; এগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি গড়তে শেখায়, এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করে। একটি বিষয়ে সবাই একমত যে জ্ঞান অর্জনের প্রধান উপায় হলো বই পড়া। যত বেশি পড়া যায়, তত বেশি জানা যায়।
ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস ব্যাকন তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘অফ স্ট্যাডিস’ -এ পড়াশোনার গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে পড়াশোনা মানুষের চিন্তাশক্তিকে উন্নত করে, বিচারবোধকে পরিণত করে ও ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি, তা গভীর উদ্বেগের। পাঠ্যাভ্যাস ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে, আর তার জায়গা দখল করছে ক্ষণস্থায়ী, পৃষ্ঠতলীয় তথ্যভোগ। এর ফলশ্রুতিতে জন্ম নিচ্ছে এক ‘নির্বাক প্রজন্ম’ যারা কথা বলে, কিন্তু চিন্তার গভীরতায় নীরব।
ডিজিটাল বিপ্লব নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়। কিন্তু এই বিপ্লবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দ্রুতগতির, সংক্ষিপ্ত কনটেন্টের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেড়েছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, শিরোনামভিত্তিক সংবাদপাঠ, কিংবা অ্যালগরিদম-নির্ভর তথ্যপ্রবাহ আমাদের মনোযোগের পরিসর সংকুচিত করে ফেলছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে।
চিন্তার গভীরতা কমে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যা অনেক সময় আবেগপ্রসূত, কিন্তু যুক্তিহীন। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তারা তথ্যপ্রাপ্তিতে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে, কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে।
পাঠ্যাভ্যাস না থাকলে ভাষা দুর্বল হয়, ভাব প্রকাশ সীমিত হয়ে পড়ে, আর যুক্তি নির্মাণের দক্ষতা ক্ষয়ে যায়। ফলে তৈরি হয় এমন এক প্রজন্ম, যারা নিজের মত প্রকাশে অস্বস্তি বোধ করে কিংবা ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা শুনতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না; দেখতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে বুঝতে পারে না।
এটি কেবল সাংস্কৃতিক সংকট নয়, বরং গণতান্ত্রিক চেতনার জন্যও হুমকি বটে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সচেতন, সমালোচনামূলক চিন্তাশীল নাগরিক। যদি মানুষ পড়াশোনা না করে, বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে অবগত না থাকে, তবে তারা সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে। তখন মতামত গড়ে ওঠে তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রচার-প্রচারণার প্রভাবে। এর ফলে সমাজে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় গুজব, বিভ্রান্তি ও মেরুকরণ। তবে এই চিত্র সম্পূর্ণ নিরাশাজনক নয়।
পাঠ্যাভ্যাস পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ এখনো রয়েছে। প্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে তা সম্ভব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানসম্মত বই, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট সহজলভ্য করা গেলে তরুণদের আগ্রহ বাড়তে পারে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, স্কুলে পাঠাভিত্তিক আলোচনা বৃদ্ধি করা, এবং গণমাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্টের প্রসার ঘটানো জরুরি। গ্রামে গ্রামে তৈরী করা যেতে পারে পাঠাগার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে প্লেটের পরিবর্তে দেওয়া যেতে পারে একটি করে বই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পড়াকে আবার আনন্দের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। পাঠ্যাভ্যাস যদি চাপ হিসেবে নয়, বরং আনন্দ ও আত্ম-অন্বেষণের পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এর দিকে ফিরে আসবে।
পাঠ্যাভ্যাসের মৃত্যু মানে কেবল বই থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; এটি চিন্তার মৃত্যু, প্রশ্ন করার সাহসের মৃত্যু। আর সেই শূন্যতা পূরণ করে একটি নির্বাক প্রজন্ম। যারা শব্দে উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু ভাবনায় নিঃশব্দ। এই প্রবণতা রুখতে এখনই উদ্যোগ না নিলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা একটি দুর্বল বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার রেখে যাব। সময় এসেছে পড়ার টেবিলে আবার আলো জ্বালানোর।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
কেকে/ এমএস