বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে বন উজাড়ের ঘটনা ঘটছে। বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে প্রভাবশালীরা ২০০ একরের বেশি বনভূমি ধ্বংস করে কাঠ পাচার করেছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। বন উজাড়ের ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানি সংকট। বনভূমি রক্ষা আর পাহাড়-প্রকৃতি সুরক্ষা করে দুর্গম এলাকার জনগণের সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর তাগিদ স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের।
এ ব্যাপারে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, বৃক্ষ নিধনের খবর পেয়ে তিনি পুলিশের একটি দল ও বন বিভাগের জনবল নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে গাছ পরিবহনের জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে শতবর্ষী বৃক্ষ ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটে পাচার করা হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে পাইনি। ভেকুটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে দুই কক্ষের একটি শ্রমিকদের থাকার ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে আলীকদমে দুটি করাতকলে অভিযান চালিয়ে পাচার হওয়া কিছু কাঠ জব্দ করা হয়েছে। করাতকল দুটিকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। একটি করাতকলে ৬২৫ পিস কাঠ এবং আর একটি করাতকল থেকে ২৭২ পিস কাঠ জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিধি অনুযায়ী করাতকলে থাকা কাঠের উৎস সম্পর্কে রেজিস্টারে তথ্য থাকার কথা। কার কাছ থেকে কাঠগুলো কেনা হয়েছে, সে তথ্য থাকার কথা থাকলেও করাতকল দুটিতে সেসব তথ্য ছিল না। আলীকদমে একটি প্লাইউড কারখানাতেও অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে থাকা কাঠের উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।
সরেজমিন অনুসন্ধান বলছে, বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাকপাড়া, কাকইপাড়া, আদুইপাড়াসহ আশপাশ এলাকার প্রায় ২০০ একরের বেশি ভূমির বন উজাড় করে ফেলেছে একটি অসাধু বনখেকো চক্র। শুধু বনের গাছ উজাড় করেই শেষ নয়; পাহাড়ের বুক চিরে মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। পানির উৎস নষ্ট করে ভরাট করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ঝিরি। অন্যদিকে কাটা গাছের অবশিষ্ট অংশ আলীকদমের বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটা ও করাতকলে নিয়মিত বিক্রি করা হচ্ছে।
বন উজাড়ের ফলে প্রতিনিয়ত চোখে পড়া হরিণ, শূকর, বন মোরগসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। দুর্গম এলাকার একমাত্র পানির ভরসা পাহাড়ি ঝিরি নষ্ট হওয়ায় তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনুসন্ধান আরও বলছে, লামা বন বিভাগ ও আলীকদমে অর্ধশতাধিক অবৈধ করাতকল ও ইটভাটা রয়েছে। লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও তার সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের একটি চক্র এসব অবৈধ ইটভাটা ও করাতকলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বনের গাছ জোগান দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ করাতকলগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এ চক্রটির বিরুদ্ধে। বনের গাছ করাতকলগুলোতে চেরাই করার পর তা নিবিঘ্নে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হচ্ছে। গাছের টুকরো ও গুঁড়ি অবাধে পোড়ানো হচ্ছে অবৈধ ইটভাটাগুলোতে।
দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের প্রত্যক্ষ মদদে বন নিধনযজ্ঞ চললেও দৃশ্যমান ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না আলীকদম উপজেলা প্রশাসনকে। লামা বন বিভাগের অধীন ছয়টি রেঞ্জে অবাধে বনের গাছ কর্তন বন্ধ করতে নীরব ভূমিকা পালন করছে বন বিভাগের হর্তাকর্তারা।
স্থানীয় অধিবাসী লুংলেই ম্রো জানান, আগে বনে অনেক বন্যপ্রাণী ছিল। নির্বিচারে গাছ কাটায় বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। ঝিরির পানি শুকিয়ে গেছে। আমাদের এখন তীব্র পানি সংকট। আমাদের এ ঝিরিতে এক সময় পর্যাপ্ত পানি ছিল। এখন গাছ কেটে ফেলায় ঝিরিগুলো শুকিয়ে গেছে। সারা দিন অপেক্ষা করেও এক কলস প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জোয়াম লিয়ান আমলাই জানান, অসাধু ব্যবসায়ীরা বন উজাড় করছে, অথচ বন বিভাগ জানে না—এ কথা মেনে নেওয়া যায় না। লামায় গত দুই বছর ধরে এ নিধনযজ্ঞ চললেও বন বিভাগ নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় আছে। বন বিভাগের মদদে বৃক্ষ নিধনযজ্ঞ চলছে। বন বিভাগ এ নিধনযজ্ঞের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে বন উজাড় অবশ্যই ঠেকাতে হবে।
বান্দরবান জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অং চ মং বলেন, আলীকদম উপজেলায় নির্বিঘ্নে শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। যেখানে পাড়াবন এলাকায় একটি বাঁশ কাটতেও অনুমতি লাগে, সেখানে এভাবে বন নিধনযজ্ঞ চললে প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়া দরকার। নির্বিঘ্নে বৃক্ষ নিধন বন্ধ করা জরুরি। স্থানীয় হেডম্যানসহ নেতাদেরও এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জোত পারমিটের আড়ালেও বন বিভাগের অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। একবার অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না, বৃক্ষ নিধনও বন্ধ হবে না।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগ পারমিটের নামে হাজার হাজার ঘনফুট গাছ কেটে ফেলার অনুমতি দিচ্ছে। এক হাজার ঘনফুট গাছ কাটার অনুমতি দিলে সেখানে আরও কয়েক হাজার ঘনফুট গাছ অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে। এসব গাছ আবার পারমিটের আড়ালে পাচার করা হচ্ছে।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে কাঠ জব্দ করা হয়েছে। যেখানে বৃক্ষ কর্তন করা হয়েছে, সেটি বনভূমি নয়, ডিসির ভূমি।’ গাছ কর্তন ও পরিবহনে অনুমতি প্রয়োজন পড়ে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনুমতি নিতে হবে। কাঠ পরিবহনের জন্য ট্রানজিট পাস নিতে হবে।’
কেকে/এলএ