ভারি বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি ও বন্যার শঙ্কায় হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যেই ভারি বৃষ্টি পাতের কারনে হাওড় এলাকার প্রায় ৪০০ হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে সময়ের আগেই ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
তবে শ্রমিক সংকট, হারভেস্টর মেশিনের অতিরিক্ত ভাড়া এবং বাজারে ধানের দরপতনে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই বলছেন, লাভ তো দূরের কথা এই মৌসুমে মূলধন টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে ধান পাকলেও হঠাৎ ভারি বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে অনেকের ক্ষেতেই ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে বন্যার শঙ্কা থাকায় দ্রুত ধান কাটার চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় শ্রমিক না থাকায় অধিকাংশ কৃষকই এখন নির্ভর করছেন হারভেস্টর মেশিনের ওপর।
নবীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের দত্তগ্রামের কৃষক আব্দুর রকিব হক্কানী বলেন, “শিলাবৃষ্টিতে আমার প্রায় দুই বিঘা জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন যা আছে তা দ্রুত না কাটলে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। কিন্তু হারভেস্টরের সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে।”
একই উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের কৃষক শফিক মিয়া বলেন, “এক বিঘা জমির ধান কাটতে ২ হাজার টাকারও বেশি লাগছে। বর্তমান ধানের বাজারমূল্য মণপ্রতি ৬০০-৬৫০ টাকা। এই দামে বিক্রি করে খরচই উঠবে না। ঋণ করে চাষ করেছি, এখন কিভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।”
গজনাইপুর এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, বাধ্য হয়ে মেশিনেই ধান কাটতে হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টি আর কাদার কারণে মেশিন ঠিকভাবে কাজও করতে পারছে না। এতে খরচ আরও বৃদ্ধি যাচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৮ হাজার ৯৫৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৫ হাজার ৬০৬ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ১৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমি রয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮২ হাজার ৪২২ মেট্রিক টন চাল। ধান কাটার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ১১৬টি হারভেস্টর মেশিন।
সরকারিভাবে প্রতি বিঘা জমিতে হারভেস্টরের ভাড়া ১ হাজার ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে হারভেস্টর মালিকরা বলছেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত তেল সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় কাদামাটিতে কাজ করার কারণে তাদের খরচ বেড়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক মনি বলেন, “দুই দিনের ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে হাওর এলাকার প্রায় ৪০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। হারভেস্টরের সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পাশাপাশি দ্রুত ধান কাটতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, কৃষকদের দাবি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাত টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। অন্যথায় চলতি মৌসুম শেষে অনেক কৃষকই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।
কেকে/এসএম