বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দশক ধরে অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং বা ব্যবহার শুরু হয়েছে গত মঙ্গলবার। এর মধ্যদিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশের। এর মাধ্যমে বিশ্ব পরমাণু ক্লাবের ৩৩তম সদস্য হিসেবে আমাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
এটি শুধু একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে এক বিশাল মাইলফলক। তবে এ গৌরবের সমান্তরালে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বিগত দিনে উঠেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মূল লক্ষ্য ছিল সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রকল্পটি তিন বছরেরও বেশি পিছিয়ে গেছে। এ বিলম্বের ফলে বাংলাদেশকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত সুদ গুনতে হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী এটি একটি ‘টার্নকি’ প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও বিলম্বের এ বিশাল আর্থিক দায়ভার কেন রাষ্ট্রের ওপর পড়বে, তা নিয়ে জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে অনেকটা বেড়ে গেছে। এ ধরনের মেগা প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।
প্রযুক্তির চেয়েও বড় সংকট দেখা দিয়েছে প্রকল্পটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। পারমাণবিক নিরাপত্তা শুধু মজবুত কংক্রিট বা উন্নত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না; এটি মূলত নির্ভর করে সেখানে কর্মরত প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দক্ষতা, নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের ওপর। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (ওঅঊঅ) বারবার সতর্ক করেছে যে, পারমাণবিক স্থাপনায় নিরাপত্তা সংস্কৃতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নিয়োগ ও পদোন্নতি শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রূপপুর প্রকল্পে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অসন্তোষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা কর্মকর্তারা যদি একে একে চলে যান, তাহলে রূপপুরের টেকসই মানবসম্পদ কাঠামো কোথায় দাঁড়াবে এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ৩২টি দেশে পরিচালিত প্রায় ৪৪০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোথাও এমন নজির পাওয়া যায় না। চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো বিপর্যয় আমাদের শিখিয়েছে যে, সামান্যতম ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি বা ভুল সিদ্ধান্ত কত বড় মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে তিনটি বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন :
১. আন্তর্জাতিক মানের এইচআর অডিট : ওঅঊঅ-এর নির্দেশিকা মেনে একটি স্বাধীন কমিটি দ্বারা নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করতে হবে। ২. নিরাপত্তা সংস্কৃতির বিকাশ : এমন একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে জ্যেষ্ঠতা নয়, বরং কারিগরি সত্যই শেষ কথা। একজন কনিষ্ঠ প্রকৌশলীও যেন নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশ্ন তুলে পুরস্কৃত হন, দণ্ডিত নয়। ৩. আর্থিক দায়বদ্ধতা : প্রকল্পের বিলম্বের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সমন্বয়ের বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি আমরা প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের ওপর বিনিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনায় শতভাগ পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে পারি। মনে রাখতে হবে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক দায়িত্ব। আগামী আগস্টে যখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু হবে, তখন আমরা যেন শুধু মেগা প্রজেক্টের জৌলুস নয়, বরং একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা পাই এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
কেকে/ এমএস