মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ইপিজেডগুলোকে নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪২ এএম

বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে ইপিজেড অত্যন্ত সফল অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর অন্তরালে বিদ্যমান শ্রম অধিকারের প্রশ্নটি দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই অঞ্চলগুলোকে যে বিশেষ আইনি সুরক্ষা ও স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই আইএলও এবং বিশ্বজনীন মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন ইপিজেডগুলোর শ্রম পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের তোয়াক্কা না করার ব্যাপারটি দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সক্ষমতার জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুরু থেকেই এই অঞ্চলগুলোকে দেশের প্রচলিত সাধারণ আইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার একটি সচেতন প্রচেষ্টা ছিল। ১৯৮০ সালে যখন ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ‘আইসোলেটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনক্লেভ’ তৈরি করা যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না এবং উৎপাদন কার্যক্রম হবে নিরবচ্ছিন্ন। এই ‘নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন’ নিশ্চিত করার দোহাই দিয়ে ইপিজেডগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার মৌলিক অধিকারটি স্থগিত রাখা হয়েছিল ।

আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার গোষ্ঠী, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপে ২০০৪ সালে ‘ইপিজেড শ্রমিক সংগঠন ও শিল্প সম্পর্ক আইন’ প্রবর্তন করা হয়। এই আইনটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো 'শ্রমিক কল্যাণ সমিতি' গঠনের সুযোগ দেওয়া হলেও তা কখনোই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের সমতুল্য হতে পারেনি। পরবর্তীতে এই আইনটি বেশ কয়েকবার সংশোধিত হয় এবং সবশেষে ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯’ প্রণীত হয়। যদিও সরকার দাবি করে যে এই আইনটি আইএলও-র নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ ও সংজ্ঞায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনো গভীর উদ্বেগ রয়েছে ।

ইপিজেডগুলোর সবচেয়ে বড় সমালোচনার দিক হলো এর প্রশাসনিক কাঠামো। বাংলাদেশের সাধারণ কলকারখানাগুলো শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর দ্বারা পরিদর্শিত হয়। কিন্তু ইপিজেডগুলো পরিচালিত হয় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বেপজার মাধ্যমে। বেপজা এখানে একই সঙ্গে নীতি-নির্ধারক, প্রশাসক এবং বিচারকের ভূমিকা পালন করে। 

বেপজার শীর্ষ পদে সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক জনবল নিয়োগের ফলে এখানে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে যা শ্রমিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের পরিপন্থি। এই বিশেষায়িত আইনি ব্যবস্থা শ্রমিকদের জন্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে তারা একই দেশে বাস করেও ভিন্নতর এবং নিম্নতর আইনি সুরক্ষার শিকার হচ্ছেন ।

আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের মৌলিক ভিত্তি হলো ‘ফ্রিডম অফ অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ‘কালেক্টিভ বারগেইনিং’ (আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮)। বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোতে এই দুটি অধিকারই অত্যন্ত সংকুচিত। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন প্রতি বছর যে গ্লোবাল রাইটস ইনডেক্স প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের ১০টি নিকৃষ্টতম দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের রেটিং হলো ৫, যার অর্থ হলো এখানে শ্রমিকদের অধিকারের কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং আইনের শাসনের অভাব প্রকট। বিশেষ করে ইপিজেডগুলোতে শ্রমিকদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য পুলিশি নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলা দায়ের করা একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইপিজেডগুলোতে নারী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত মৌখিক ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন। কারখানার অভ্যন্তরে অভিযোগ করার মতো কোনো স্বাধীন ব্যবস্থা না থাকায় নারীরা মুখ খুলতে ভয় পান। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের সুপারভাইজাররা কুপ্রস্তাব দেয় এবং তাতে রাজি না হলে কর্মদক্ষতার অজুহাতে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। 

ইপিজেড শ্রম আইনে যৌন হয়রানি রোধে কোনো সুস্পষ্ট গাইডলাইন বা অভ্যন্তরীণ কমপ্লেইন্ট কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা নেই, যা সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের নির্দেশনারও পরিপন্থী। নারী শ্রমিকদের রাতের বেলা কাজ করানো নিষিদ্ধ হলেও ওভারটাইমের দোহাই দিয়ে অনেক সময় রাত ৮টার পরেও তাদের কারখানায় আটকে রাখা হয়। ইপিজেডগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। 

বিশেষ করে আইএলও এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক শিল্পের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে কয়েকজন শ্রমিক প্রতিনিধির অভিযোগের ভিত্তিতে আইএলও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে। এর প্রধান কারণ ছিল- শ্রমিকদের সংগঠনের অধিকার না দেওয়া, শ্রম পরিদর্শনে ঘাটতি এবং শ্রমিকদের ওপর সহিংসতা। এই অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশ সরকারকে একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। 

রোডম্যাপের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো- ২০২৫ সালের মধ্যে ইপিজেড শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে আসা এবং সাধারণ শ্রম আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য বিধান করা। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আইএলও-র গভর্নিং বডি তাদের অধিবেশনে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ কিছু প্রশাসনিক অগ্রগতি করলেও আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে। 

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এরপর এই সুবিধা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস স্কিমের আওতায় আবেদন করতে হবে। জিএসপি প্লাস পাওয়ার জন্য ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে চলা বাধ্যতামূলক, যার মধ্যে শ্রম অধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ইইউ কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, যদি ইপিজেডগুলোতে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ না দেওয়া হয় এবং শ্রম আইনের যথাযথ সংস্কার না হয়, তবে বাংলাদেশ এই সুবিধা পাবে না। যদি জিএসপি প্লাস সুবিধা না পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে গড়ে ৮.৭% শুল্ক আরোপিত হবে, যার ফলে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় কমতে পারে।

ইপিজেডগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে অনস্বীকার্য ভূমিকা রেখেছে, তা টিকিয়ে রাখতে হলে শোষণের মডেল থেকে বেরিয়ে এসে ‘শোভন কাজ’-এর মডেলে প্রবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের তোয়াক্কা না করার যে সংস্কৃতি গত চার দশক ধরে ইপিজেডগুলোতে তৈরি হয়েছে, তা এখন দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। 

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তখনই সার্থক হবে যখন সমৃদ্ধির অংশীদার হবে দেশের কোটি কোটি মেহনতি শ্রমিক। ২০২৬ সালের পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোকে শোষণের ক্ষেত্র থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে।

লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close