মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
রূপপুর : সংকট থেকে সক্ষমতায় উত্তরণ
শিমলা পাল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিশ্বের মাত্র ৩৩টি দেশের হাতে আছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাবিকাঠি, সেই অভিজাত ক্লাবে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। পদ্মা নদীর ঢেউয়ে যেমন পলি জমে উর্বর হয় এই দেশ, তেমনি পাবনার ঈশ্বরদীর চরে আজ রূপপুরের হাত ধরে জমছে সমৃদ্ধির নতুন পলি। ইউরেনিয়ামের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে যে অসীম তেজ উপচে পড়ছে, তা আজ বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে দেওয়ার নেশায় মত্ত। 

২৮ এপ্রিল ২০২৬, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রমাণের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। যখন তপ্ত দুপুরে অসহ্য লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, যখন জ্বালানি সংকটে কল-কারখানার চাকা থমকে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমাদের জন্য এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। 

বছরের পর বছর ধরে আমরা আমদানিকৃত কয়লা আর গ্যাসের অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে অন্ধকার কাটানোর স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু রূপপুর সেই পরনির্ভরশীলতার শিকল ভেঙে আমাদের দিচ্ছে এক অবিনাশী শক্তির নিশ্চয়তা। মাত্র এক কেজি ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়, তা পেতে প্রায় ১০০ টন উচ্চমানের কয়লার প্রয়োজন হয়; এই সাধারণ সমীকরণই বলে দেয় আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কতটা মজবুত হতে যাচ্ছে। 

২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে যখন প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সুসংহত হচ্ছে, তখন তা কেবল লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, বরং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে আমাদের শিল্প-কারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করছে। এটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে একটি আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করবে। 

বর্তমানের এই দুঃসহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর জ্বালানি সংকটের গোলকধাঁধায় রূপপুর কেবল একটি মেগা প্রজেক্ট নয়, এটি বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে উদিত এক নতুন পারমাণবিক সূর্য। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় যখন জ্বালানি তেলের বাজার চড়া আর গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল, তখন দেশের বিদ্যুৎ খাত এক চরম অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি থমকে আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ। এই অন্ধকার সময়ে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে আসা ১,২০০ মেগাওয়াট এবং পরবর্তীতে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হবে আমাদের অর্থনীতির মূল অক্সিজেন। 

পারমাণবিক বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্থিতিশীলতা। আবহাওয়া বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এখানে কোনো বাধা হতে পারে না। একবার জ্বালানি লোড করার পর এটি দীর্ঘ ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। ফলে গ্রিডে বিদ্যুতের যে ঘাটতি বর্তমানে আমাদের ভোগাচ্ছে, রূপপুর সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে স্থিতিশীল আলোর এক দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি।

অর্থনৈতিক মানদণ্ডে রূপপুরের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও বৈপ্লবিক। কয়লা বা গ্যাসচালিত কেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। যখন জ্বালানি আমদানির পেছনে আমাদের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে, তখন রূপপুর আমাদের সেই ব্যয়ের বোঝা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। 

সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেলে দেশের শিল্পায়নে আসবে নতুন গতি, তৈরি হবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের যে জেলাগুলো একসময় শিল্পে পিছিয়ে ছিল, রূপপুরকে কেন্দ্র করে সেখানে এখন গড়ে উঠবে নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল। মানুষের জীবনযাত্রার মান কেবল উন্নতই হবে না, বরং বিদ্যুতের সহজলভ্যতা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের পথকে করবে মসৃণ ও কণ্টকমুক্ত।  

কিন্তু কিছু বিষয় মাথা না রাখলেই নয় ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই মাসে একই মহাদেশের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে দুটি ভিন্নধর্মী মাইলফলক অর্জন করেছে। তবে এই অর্জনের ধরন, দর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

ভারতের পারমাণবিক যাত্রার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে, কেমব্রিজ ফেরত বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার হাত ধরে। নেহরু জমানায় গৃহীত সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি স্বনির্ভরতা। ভারত জানত যে তাদের কাছে পারমাণবিক বিদ্যুতের মূল জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম-২৩৫’ নেই, কিন্তু প্রচুর পরিমাণে আছে ‘থোরিয়াম’। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণার পর গত ৬ই এপ্রিল তামিলনাড়ুর কালপাক্কাম পারমাণবিক কেন্দ্রে ভারত এক অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। 

তারা প্লুটোনিয়ামকে সফলভাবে ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তর করেছে। হোমি ভাবার সেই বিখ্যাত ‘তিন ধাপের পরিকল্পনা’ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে। ২০৪০ সাল নাগাদ ভারত জ্বালানি আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা বা চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের খরচ হয়েছে মাত্র ১০,৫০০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে উৎসবমুখর। তবে এই প্রকল্পের অন্দরমহল বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক চিত্র বেরিয়ে আসে। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে অর্জিত সাফল্যের খরচ যেখানে ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা, সেখানে রূপপুরে বাংলাদেশের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। 

ঋণের সুদ, মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে এই ব্যয় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। প্রতি ইউনিট ২-৩ টাকায় বিদ্যুৎ পাওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তাতে শুধু অপারেশনাল খরচ ধরা হয়েছে। বিনিয়োগের বিশাল ঋণের কিস্তি ও সুদ যোগ করলে এই বিদ্যুৎ মোটেও সস্তা হবে না। এছাড়া রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ মাত্র ৬০ বছর। বিপরীতে ভারতের থোরিয়াম প্রযুক্তির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, কারণ এটি তাদের নিজস্ব সম্পদ ও অবিরাম গবেষণার ফসল।

ভারতের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তারা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে শুরু করে মহাকাশ বিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষ জনবল তৈরি করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের করুণ দশা প্রকল্পের ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে পারমাণবিক কেন্দ্র সবখানেই আমাদের বিদেশি বিশেষজ্ঞ ভাড়া করতে হয়। 

১২ হাজার টাকায় বালিশ বা ১ লাখ টাকায় নাট-বল্টু কেনার মতো দুর্নীতির মহোৎসব প্রকল্পের খরচকে আকাশচুম্বী করেছে। দেশের আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে তৈরি যেখানে বিনামূল্যে প্রযুক্তি বা রিসার্চ ফ্যাসিলিটি এনে দিলেও তা গ্রহণ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হয় না।

ভারত যখন ২০৪০ সালে জ্বালানি-স্বতন্ত্র এক পরাশক্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে একটি আমদানিকৃত প্রযুক্তির ওপর টিকে থাকার চেষ্টা করছে। সমুদ্র সৈকতে থোরিয়ামের মজুত আমাদেরও ছিল, অভাব ছিল কেবল মেধা ও দেশপ্রেম সংবলিত একটি দূরদর্শী পরিকল্পনার। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণাগারে বিনিয়োগ এবং পরনির্ভরশীল মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। অন্যথায়, রূপপুর আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার চেয়ে অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবেই বেশি পরিচিতি পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের  ও জ্বালানি সংকটের এই কঠিন সময়ে রূপপুর আমাদের দেখাচ্ছে এক সবুজ ও পরিচ্ছন্ন আগামীর পথ কিন্তু এটি পরিচালনা করবার ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে।  কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই এখান থেকে পাওয়া যাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখবে। 

কোনো প্রকার বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই এখান থেকে দীর্ঘ ৬০ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলবে, তবে সদা সতর্ক থাকতে হবে যাতে রাশিয়অর চেরনবিল কিংবা জাপানের ফুকুশিমার মতো বিপদ না ঘটে। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকেও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে জরুরি বিষয় হলো যত দ্রুত সম্ভব জ্বালানির কাচামালের রুপান্তর ঘটিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথটি খুঁজতে হবে আমাদের। 

সর্বোপরি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল পারমাণবিক শক্তির অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করেনি, বরং জয় করেছে জ্বালানি অনিরাপত্তার ভয়কে। অন্ধকার ছিঁড়ে আলোর এই মিছিলে রূপপুরই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় আশার দীপশিখা ভয়ের ও কিছুটা।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close