গণপরিষদ, গণভোট ও সংস্কারের ইস্যুতে সরকারকে ধরাশায়ী করতে না নতুন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার ধর্মের কার্ড নিয়ে হাজির সংসদে। সম্প্রতি জামায়াতের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান মানুষের আইনের ‘কবর’ রচনা করে দেশে পবিত্র কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেরা আগে শরিয়াহ্ আইন নিয়ে কোনো কথা বলেনি তারা। বরং নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রচলিত সাংবিধানিক পদ্ধতিতে দেশ চালানোর প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিল দলটি। এমনকি ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ্ আইন বাস্তবায়ন করবে না বলেও জানিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত সবসময়ই আল্লাহর আইন বা শরিয়াহ্ বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলেছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে তারা সে অবস্থান থেকে সরে আসে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ভোট টানতে তারা বলেছিল, ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ্ আইন বাস্তবায়ন করা হবে না। এমনকি একটি আসনে একজন সনাতন ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থীও করেছিল জামায়াত। তাদের প্রার্থীরা গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালানার কথাই বলেছিলেন নির্বাচনি প্রচারে। কিন্তু এখন সংসদে এসে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের দাবি তুলছে। যা তাদের স্ববিরোধিতাই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এ অবস্থান তাদের স্বভাবসিদ্ধ কূটকৌশলেরই অংশ। কারণ যা তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল না, সেই দাবি এখন তারা কেন তুলছে। অন্যদিকে বিএনপির সরকার পরিচালনা করবে নিজেদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। বিএনপি একটি মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। তারা ধর্মীয় রাজনীতি করে না। তারা কেন শরিয়াহ্ চালু করবে। বরং বিএনপি সব সময়েই বলেছে, তারা এমন কোনো আইন বাস্তবায়ন করবে না যা শরিয়াহ্ বিরোধী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, জামায়াতের হঠাৎ এ দাবির পেছনে রয়েছে অপরাজনীতি। কারণ শুরু থেকেই নানা ইস্যুতে তারা সরকারকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। গণভোট, সংস্কার ইস্যুতে মাঠ গরম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে সাফল্য আসেনি। তাই ধর্মের কার্ড ব্যবহারের পুরোনো পথেই হাঁটছে দলটি। অহেতুক ধর্ম নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে জামায়াত।
এদিকে শরিয়াহ আইন নিয়ে সংসদে বিরোধীদলের অবস্থান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরোধী দল, জামায়াতে ইসলামী বলেছেন শরিয়াহ আইন কায়েম করবে। অথচ গত ১৪ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যখন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধি দল দেখা করতে গিয়েছিল, সেখানে স্পষ্টভাবেই জামায়াত আমির বলেছেন যে, তারা শরিয়াহ আইন রাখবেন না। ক্ষমতায় গেলে তারা সংবিধান দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন।’
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা খেয়াল করেছি ২০১২ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বজায় রাখার জন্য তারা আরও বেশকিছু পরিবর্তন এনেছেন। তাদের গঠনতন্ত্রে ছিল যে, আল্লাহর আইন কায়েম করতে হবে, আল্লাহর শাসন কায়েম করতে হবে, সার্বভৌমত্ব, ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারা পরিবর্তন নিয়ে আসছেন। আমাদের সাংবিধানিক যেসব শব্দগুলো আছে, সেভাবে তারা এটাকে রিপ্লেস করেছেন। এভাবে জন্ম লগ্নের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে হতে গত জানুয়ারি মাসে শরিয়াহ আইন বাতিল করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে তারা রাজনীতি করার প্রস্তুতি আমরা দেখেছিলাম পত্রিকায়, সে জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু পার্লামেন্টের এখন নতুন করে যেহেতু প্রশ্ন আসছে, আমি গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের কাছে জানতে চাই এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী?’
এর আগে গত বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আল্লাহর আইন চাই। আপনারা (বিএনপি) আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করবেন না বলেছেন। অতএব আসুন বাংলাদেশে মানুষের আইনের কবর রচনা করে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করি।’
দেশে ইসলামী আইন চালু করার জন্য একটি ইসলামী বোর্ড গঠন করারও আহ্বান জানান জামায়াতের এ সংসদ সদস্য। এ জন্য তিনি মাদ্রাসা থেকে পাস করা সংসদ সদস্য এবং সংসদের বাইরে যত মাযহাবের আলেম আছেন, তাদের নিয়ে এ বোর্ড গঠন করার পরামর্শ দেন।
তার মতে এ বোর্ড ইসলামী আইন চালু করার পরামর্শ দেবে এবং দেশে সেই আইন কার্যকর হবে।
মুজিবুর রহমান বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, তারা শরিয়তের আইন বিশ্বাস করেন না। পরে অবশ্য আত্মসমর্পণ করে নির্বাচনের আগে বলেছেন শরিয়তের বিরুদ্ধে তারা কোনো আইন পাস করবেন না। তিনি বলেন, ‘ধন্যবাদ উনাকে (ফখরুল), অন্তত তওবা করে ফিরে এসেছেন।’
মুজিবুর রহমান আরও বলেন, জাতীয় সংসদের লবিতে ঢোকার সময় ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা’ এবং ‘ঈমান’ এটা দেখার পর তার মনে হয় আল্লাহর প্রতি ঈমান থাকলে আইনের উৎস হবে আল-কুরআন। কুরআনের বিধান বাংলাদেশে চালু হওয়া উচিত ছিল।
কেকে/এমএ