বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত; যা আমাদের দেশের নাগরিকদের ন্যূনতম জীবনমান, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। উপর্যুক্ত পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি সুস্থ জাতি ছাড়া কখনোই দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না।
চিকিৎসা সেবা শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; এটি একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই একটি কার্যকর, সুলভ এবং সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সীমিত বাজেট বরাদ্দ এবং দুর্বল নীতিগত বাস্তবায়ন এই খাতকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ন্যূনতম ৫ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন, অথচ বাংলাদেশে এই বরাদ্দ এক শতাংশেরও কম-যা খাতটির অগ্রাধিকারের ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীদের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই চরম মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে শয্যার তীব্র সংকট। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে অধিকাংশ মানুষ সিট পায় না; বাধ্য হয়ে মেঝে, সিঁড়ি, এমনকি বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বারান্দায় জায়গা না থাকায় ছাদেও অস্থায়ীভাবে রোগী রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
একটি ১০০ শয্যার হাসপাতালে ৩০০-৫০০ রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার ঘটনা এখন আর অস্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যা রোগীর সুস্থতার জন্য নতুন ঝুঁঁকি তৈরি করে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অনিয়ম রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে। এখানে আরেকটি বড় ও কাঠামোগত সংকট হলো চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৪৪.৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য গড়ে মাত্র ১০-১২ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। একজন চিকিৎসককে যেখানে গড়ে প্রায় ১,৬০০-২,০০০ মানুষের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, সেখানে একজন নার্সকে ২,৫০০-৩,০০০ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ফলে রোগীদের প্রতি পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না এবং সেবার মান কমে যায়।
অন্যদিকে, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের চিত্র ভিন্ন হলেও সমস্যার ধরন আরও জটিল। সেখানে উন্নত যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি যে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একজন রোগীকে প্রথমে ডাক্তার দেখানোর জন্য ফি দিতে হয়, এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়Ñঅনেক সময় যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন থাকে। রিপোর্ট দেখানোর জন্য আবার আলাদা ফি দিতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় রোগীকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষা, সেবার মানের তারতম্য এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগও অস্বাভাবিক নয়। এখানে আরও একটি গুরুতর বিষয় হলো-বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধ কোম্পানিকে ঘিরে গড়ে ওঠা অস্বচ্ছ সিন্ডিকেট।
অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেওয়া, কমিশনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন এবং নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা রোগীদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রির ঘটনাও দেখা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আইসিইউ সেবা-যেখানে অনেক ক্ষেত্রে দিনে লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অথচ এত ব্যয় করেও সবসময় মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। ফলে রোগীরা একদিকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন, অন্যদিকে কাক্সিক্ষত সেবাও পাচ্ছেন না। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। অবকাঠামোর অভাব, নিরাপত্তাহীনতা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেক চিকিৎসক গ্রামে কাজ করতে অনাগ্রহী। ফলে সেখানে হাতুড়ে চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে।
নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফার্মেসিই হয়ে উঠছে চিকিৎসার বিকল্প কেন্দ্র, যেখানে প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তিরা চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করছে। শুধু রামেকেই জানুয়ারি থেকে মার্চ-এই তিন মাসে ৮৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউর অপেক্ষায় এক মাসেই শতাধিক শিশুর প্রাণ ঝরে গেছে। এই সামগ্রিক দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪,৬০৩ জন, আর সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৩২,০২৮ জন। এ সময়ের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪৩ শিশু, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ২১৬ শিশুর- যা কার্যত মহামারির রূপ নিচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছে, যা কার্যত আমাদের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
একটি টিকাদানযোগ্য রোগ এত বড় আকার ধারণ করা প্রমাণ করে- সচেতনতা, সেবার প্রাপ্যতা এবং ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই সবকিছুর ফলে মানুষ ক্রমেই দেশের বাইরে চিকিৎসার দিকে আগ্রহী হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং এতে ব্যয় হয় প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার সমান।
একইভাবে এর বিশ্লেষণেও দেখা যায়, চিকিৎসা বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রতি বছর দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের কারণে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতমুখী চিকিৎসা প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। যদিও চিকিৎসা পদ্ধতির দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মৌলিক কোনো বড় পার্থক্য নেই, তবুও রোগীর প্রতি সময় দেওয়া, উন্নত ব্যবস্থাপনা, সঠিক কাউন্সেলিং এবং তুলনামূলক কম খরচ মানুষকে বিদেশমুখী করছে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে দেশে ১০-১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে বিদেশমুখী অর্থাৎ ভারতে একই চিকিৎসা কম খরচে সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং ই-হেলথ সেবা চালু করলে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ম দূর না করলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। একইসঙ্গে চিকিৎসকদের মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং রোগীর প্রতি আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে একটি সুসংহত নীতিমালার আওতায় এনে চেম্বার ফি নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বন্ধ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। একইসঙ্গে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অতিরিক্ত বিল আদায়ের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালকে জবাবদিহির আওতায় এনে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে চিকিৎসাসেবা পাবে এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না।
লেখক : গণমাধ্যম কর্মী
কেকে/এমএ