সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফাঁস হওয়া কিছু তথাকথিত গোপন নথিতে পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির উপস্থিতির খবরটি কেবল চাঞ্চল্যকরই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর অশনিসংকেত হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। গতবছর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে লড়াই করতে গিয়ে মাদারীপুরের ফয়সাল, গোপালগঞ্জের রতন ঢালি এবং সাভারের জুবায়ের নামে তিন বাংলাদেশি তরুণ নিহত হওয়ার খবর মিডিয়ায় আসার পর থেকেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেই এই উগ্রবাদী সংগঠনের থাবা বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে শাকিল হাসান নামে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। অভিযুক্তের সেলফোন ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাহিনীর আরও কোনো সদস্য বা অন্য কেউ এই চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়েছেন কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বিষয়েও বিস্তারিত খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক স্পর্শকাতর দিক উন্মোচন করেছে, যা সামরিক ও বেসামরিক উভয় বাহিনীতেই টিটিপির কথিত অনুপ্রবেশের দাবিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। ২০০৭ সালে উগ্রবাদী পশতুন নেতা বাইতুল্লাহ মেহসুদের নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান সরকারকে হটিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে কট্টর শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আল-কায়েদার আদর্শিক দিকনির্দেশনা এবং আফগান তালেবানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয়ে টিটিপি গত দেড় দশকে এক অপ্রতিরোধ্য দানবে পরিণত হয়েছে। তাদের ইতিহাসের পাতায় ২০০৯ সালে আফগানিস্তানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলা কিংবা ২০১৪ সালে পেশোয়ারের স্কুলে ১৩২ জন শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো পৈশাচিক ঘটনাগুলো তাদের চরমপন্থার স্বাক্ষর বহন করে। কিন্তু আমাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সুদূর পাকিস্তানের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ঢেউ কেন এবং কীভাবে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে টিটিপির তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে, যা বর্তমানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই আঞ্চলিক ডামাডোলের মধ্যে বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নাম জড়িয়ে পড়া কোনো গভীর আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা লড়াই বা আধিপত্যবাদী নকশার অংশ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।
এই পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর একটি প্রতিবেদন, যা গত ২৩ এপ্রিল ‘নর্থ ইস্ট নিউজ’ পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে। নন্দীর দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা ২০ এপ্রিল ভোররাতে অভিযান চালিয়ে দু’জন স্কোয়াড্রন লিডার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে আটক করেছে এবং আরও বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এমনকি নয় থেকে দশজন কর্মী পালিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে তথ্যগুলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বা ঢাকা সদর দপ্তর অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তায় তদন্ত করছে এবং যা তারা এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার পর্যন্ত করেনি, সেই অতি গোপনীয় তথ্যগুলো একজন ভিনদেশি সাংবাদিকের হাতে কীভাবে পৌঁছালো ? বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের আটক কিংবা পুলিশ সদস্য শাকিল হাসানের মতো ব্যক্তিদের নিয়ে যে তদন্ত চলছে, সেই স্পর্শকাতর সংবাদগুলো দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরের দেশে পাচার হওয়া এক বিশাল রহস্যের জন্ম দেয়। এটি কি কেবল সাংবাদিকতার সাফল্য, নাকি এর পেছনে বাংলাদেশের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বহির্বিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে চন্দন নন্দীর প্রতিবেদনে যখন দাবি করা হয় যে, পাকিস্তান সরকারই বাংলাদেশকে টিটিপির অনুপ্রবেশ নিয়ে সতর্ক করেছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার গোয়েন্দা লড়াই এক নতুন এবং জটিল মোড় নেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান অস্থিরতার মূলে রয়েছে ভারতের আফগানিস্তানের প্রতি অতি বন্ধুত্বের নীতি। ২০২১ সালের পর থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এক সময় তালেবানের ঘোর বিরোধী থাকা ভারত এখন কৌশলগত কারণে তাদের পরম মিত্র হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বন্ধু তালেবান এখন তাদের জন্য গলার কাঁটা। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ আফগান মাটিকে ব্যবহার করে টিটিপি কে অর্থ ও মারণাস্ত্র সরবরাহ করছে যেন তারা পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ২৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় গোয়েন্দাদের ঘাঁটি গাড়ার এবং সেখান থেকে টিটিপিকে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ ইসলামাবাদ বারবার আন্তর্জাতিক মহলে উত্থাপন করছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে হওয়া একাধিক ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার পেছনেও পাকিস্তান ভারতীয় গোয়েন্দা সহায়তার প্রক্সি যুদ্ধের দিকে আঙুল তুলেছে। এই ত্রিভুজমুখী দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে টেনে আনা এবং টিটিপির উত্থানের প্রচারণা চালানো কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তির সুনিপুণ পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, যারা বাংলাদেশকে একটি ভঙ্গুর ও জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে চিহ্নিত করতে চায়।
আমাদের দেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস অত্যন্ত কলঙ্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বিগত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা দেখেছি, যখনই আওয়ামী লীগ সরকার কোনো বড় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, তখনই জনগণের দৃষ্টি সরাতে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানো হয়েছে। গ্রামের সাধারণ দরিদ্র মানুষ মাদ্রাসার এতিম অসহায় ছেলেদের ধরে এনে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে তথাকথিত ‘জাহাজবাড়ি’ অপারেশনের মতো এনকাউন্টারে হত্যা করার ঘটনাগুলো ছিল ফ্যাসিবাদের ন্যায্যতা উৎপাদনের হাতিয়ার। তবে বর্তমান সরকারের আমলে গোয়েন্দা তথ্যগুলোকে আমাদের যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, কীভাবে সারাদেশে একদিনে কয়েকশ বোমা বিস্ফোরণের রহস্যজনক ঘটনার মাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিব্রত করা হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রকৃত কুশীলবদের চেহারা আজও উন্মোচিত হয়নি। আন্তর্জাতিক মহলে এক-এগারোর ভারতপন্থি সেনা অভ্যুত্থান জায়েজ করার জন্য যেমন জঙ্গিবাদ উত্থানের গল্প ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো অগণতান্ত্রিক পটভূমি তৈরির চেষ্টা চলছে কি না, তা সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের বিষয়টি যদি কেবল অনলাইন মগজধোলাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা এক রকম কিন্তু যদি নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে শাকিল হাসানের মতো ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে তা রুখতে কঠোর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিচয় দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কোনো লুকোচুরি বা কাল্পনিক প্রচার রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। অতিরিক্ত প্রচারণা অনেক সময় অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা দেয়। বর্তমান সরকারকে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ‘জঙ্গি গল্পের’ আসল শেকড় উদঘাটন করতে হবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই ধরনের খবর যদি কেবল অপপ্রচার হয়, তবে সেই তথ্য পাচারকারীদের খুঁজে বের করতে হবে। আর যদি এর সত্যতা থাকে, তবে অনুপ্রবেশকারীদের ও তাদের সহায়তাকারীদের কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে।
ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং আফগানিস্তানের কট্টর ইসলামপন্থি সরকারের মধ্যকার এই নতুন সমীকরণ যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এবং বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের দাবি। বাংলাদেশের মাটি যেন কোনো আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত না হয় এবং কাল্পনিক জঙ্গিবাদের ধোঁয়া তুলে যেন কোনো নাশকতার পরিকল্পনা সফল না হয়, সেই নিশ্চয়তা বিধান করাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় নিরাপত্তার সুরক্ষা কেবল অস্ত্র দিয়ে হয় না, বরং তথ্যের গোপনীয়তা এবং জাতীয় সংহতিই এর প্রধান রক্ষাকবচ।
কেকে/এমএ